জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে গত শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বহিরাগত ও অছাত্রমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে এ মানববন্ধন হয়। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহেদ রানার সঞ্চালনায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা বক্তব্য রাখেন সেখানে। এ সময় বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ধর্ষণের মতো অপরাধের তীব্র নিন্দা করেন। সেই সঙ্গে অছাত্ররাই বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করেন বলে অভিযোগ করেন এবং দ্রুত হল থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানান।
পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, পাঁচ কর্ম দিবসের মধ্যে অছাত্রদের হল থেকে বের করার কথা। আর তিন দিন বাকি আছে। আশা করি আগামী তিন দিনের মধ্যে অছাত্রদের হল থেকে বের করে দেওয়া হবে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই তিন দিন পর আর কোনও অছাত্র হলে থাকবে না।
ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা অনেক বক্তব্য দিয়েছি আমাদের বক্তব্য দেওয়া শেষ এখন আমাদের দাবি আদায়ের সময় এসেছে। আমাদের দাবিগুলো মানা না হলে আমরা এক দফার আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে যে অছাত্ররা থাকে তারা হলে থেকে অপরাধ করে। তারা মাদকের সিন্ডিকেট চালায়, চাঁদাবাজি করে। আর তাদের কারণে বৈধ শিক্ষার্থীদের গণরুমে থাকতে হয়। হল প্রশাসন এই অবৈধ ছাত্রদেরকে হলগুলো ইজারা দিয়ে রেখেছেন। হলে সিট বণ্টনে কাজ প্রশাসন করে না। অবৈধ ছাত্ররা সিট বণ্টনের কাজ করে। আমরা এই ধরনের অনিয়মের অবসান চাই।
ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আক্তার বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় আমরা লজ্জিত, সেদিন শুধু সেই নারীই নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ষিত হয়েছে। আমি মনে করি, গণরুম সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী। গণরুম না থাকলে শিক্ষকদের ক্ষমতা থাকবে না তাই তারা গণরুম তৈরি করে। গণরুম থেকেই সন্ত্রাসী তৈরি করে। আমরা এই গণরুমের অবসান চাই।
মানববন্ধনে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. হাসিবুর রহমান বলেন, এই ক্যাম্পাস আমাদের বাসস্থান। যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আজকে এখানে যে জনমত তৈরি হয়েছে সেটি যদি একটি ঘটনার বিচারের দাবির মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় তাহলে। এই সমবেত হওয়ার আসল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। ধর্ষক কিন্তু একদিনে তৈরি হয় না, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন ধর্ষক তৈরি হয়। একজন শিক্ষার্থীর ধর্ষক বা নিপীড়ক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় গণরুমে প্রবেশের মধ্য দিয়ে। গণরুমের পরিবেশ তার পড়াশোনাকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে সে চরম হতাশার মধ্য দিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ধর্ষণ, খুন, ছিনতাইয়ের মাধ্যমে। তাই নিপীড়ক তৈরি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রভোস্টদের মেধার ভিত্তিতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আসন নিশ্চিত করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোতাহার হোসেন বলেন, আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি আজ বিশ্ব পরিমণ্ডলে পদদলিত করেছে কিছু কুলাঙ্গার। আমরা এর থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আজকে যে পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করি না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই অভিযুক্তদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে কিন্তু এখানেই যেন শেষ হয়ে না যায়। এর আগেও দেখেছি গ্রেফতার হলেও শেষ পর্যন্ত তারা বেরিয়ে আসে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, এদের যেন প্রকৃত বিচার হয়। আমরা আজ ধর্ষণের বিরোধিতা বা শাস্তি দাবি করছি- কিন্তু আমরা তিলে তিলে যেটা গড়ে উঠতে দিয়েছি সেটার জন্য আমরা কী করেছি? প্রশাসন যেমন তড়িৎ গতিতে আমাদের এই দাবির প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটা ব্যবস্থা নিয়েছে সেটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এটা যেন দেখানোর জন্য না হয়, প্রকৃত অর্থে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই সব অছাত্র ও বহিরাগত এবং কুলাঙ্গাররা যেন এখান থেকে চলে যায়।
মানববন্ধনে, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক আলমগীর কবির, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক লুৎফুল এলাহি, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুন, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাজউদ্দীন আহমেদ, বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম আওরঙ্গজেব, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার শামীম আহমেদ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিন, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রেজোয়ানা আবেদীন, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লা হেল কাফী, ইন্সটিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলোজি পরিচালক অধ্যাপক শামীম কায়সার, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসানসহ প্রায় শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।