নির্বাচনি উৎসবে মাতোয়ারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাসজুড়ে বইছে নির্বাচনি হাওয়া। দীর্ঘদিন পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়া চত্বর, টিএসসি, মুরাদ চত্বর, টারজান পয়েন্ট, বটতলা, বিভিন্ন হল সংলগ্ন চত্বর, শহীদ মিনার চত্বর থেকে শুরু করে বিভাগগুলোতে চলছে প্রার্থীদের প্রাণবন্ত প্রচারণা।

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর আগামী ১১ই সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে আটটি প্যানেল গঠিত হয়েছে। তবে প্যানেলের বাইরে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন অনেকে।

গত ২৯ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাসে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন জাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা। প্রচারণার অংশ হিসেবে মতবিনিময় সভা, লিফলেট বিতরণ, পোস্টার লাগানো এমনকি আড্ডার ফাঁকেও নিজের ভিশন তুলে ধরছেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে। প্রার্থীরা নিয়মিত হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রত্যাশাও জানাচ্ছেন প্রার্থীদের কাছে। কেউ কেউ নোট করে রাখছেন, প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন কেউ কেউ।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতেও চলছে জাকসুর গল্প। প্রার্থীদের তৈরি করা ভিডিও এবং প্রচারণা চলছে গ্রুপগুলোতে। আবার প্রার্থীদের নিয়েও ভোটাররা করছেন আলোচনা-সমালোচনা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এত বছর পর জাকসু নির্বাচন হওয়ায় বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে। অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখছেন।

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন বলেন, জাকসু নির্বাচন আমাদের জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে আমরা প্রথমবার সরাসরি ভোট দিয়ে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। আমি মনে করি, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত ছাত্র-অধিকার আদায়ের একটি দরজা খুলবে।

জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত আক্তার বলেন, সারা ক্যাম্পাস এখন নির্বাচনি উচ্ছ্বাসে ভরপুর। প্রতিদিন নতুন নতুন পোস্টার, নতুন স্লোগান আর শিক্ষার্থীদের ভিড় দেখলে মনে হয় যেন কোনও উৎসব চলছে। তবে আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। আমরা চাই নির্বাচিত নেতারা শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে এগিয়ে আসুক।

এ ছাড়া বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীরা রাতভর আড্ডায় প্রার্থীদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। বটতলা ও টিএসসি এখন ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনার কেন্দ্রস্থল।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়েছে নতুন কলা ভবন ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি। তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন। আমরা অনেক ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।

ju1

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী সমন্বিত জোট’ প্রচারণা চালিয়েছে বিভিন্ন আবাসিক হলে ও একাডেমিক ভবনের আশপাশে। ছাত্রশিবির মনোনীত জিএস প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী সংসদ শুধু দাবি-দাওয়ার জায়গা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের ডেভেলপমেন্ট ও ন্যায্য অধিকার পাওয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। সেই ভরসা নিয়েই আমরা চাই একটি শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার্থীবান্ধব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে সমানভাবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে মানবসেবাই আমাদের আসল অঙ্গীকার। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমরা জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।

ju2

জাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যেকোনও বিশৃঙ্খলা এড়াতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, জাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রতিনিধিত্ব শূন্যতার অবসান হবে। অনেকের মতে, এই নির্বাচন নতুন নেতৃত্ব গঠনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায় রচনা করবে।