তৃতীয় দিনে গড়ালো জাকসু নির্বাচন, ক্ষোভ-শোক মিলে একাকার

বহুল প্রতীক্ষিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন আজ শনিবার তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। শুক্রবার ভোট গণনার দ্বিতীয় দিনে পরিস্থিতি রূপ নেয় বিশৃঙ্খলা, ক্ষোভ ও শোকে।

এদিকে ভোট গণনায় বিলম্ব হওয়ায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা না হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার কথা জানিয়েছেন প্রার্থীরা।

ভোট গণনার মধ্যেই শিক্ষকের মৃত্যু

জাকসু নির্বাচন এক শোকাবহ মোড় নেয়, যখন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জন্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা শুক্রবার সকালে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকালে মারা যান। তিনি আগের দিন প্রীতিলতা হলের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শুক্রবার সকালে সিনেট ভবনের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গণনা তদারকি করতে প্রবেশের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নওয়াব ফয়জুন্নেছা হলের রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক সুলতানা আখতার অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের “অব্যবস্থাপনাই” এ মৃত্যুর জন্য দায়ী। তার মতে, মেশিনের বদলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনার সিদ্ধান্ত অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব সৃষ্টি করেছে, যার ফলে কর্মকর্তাদের চরম চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। যদি হলে সেদিন রাতেই ভোট গণনা শেষ করা যেত, রাত ১১টার মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ হতো, তবে আমাদের সহকর্মীকে হারাতে হতো না।’ তিনি প্রশাসনের কাছে দায় স্বীকার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

উপাচার্যের শোক প্রকাশ

এক বিবৃতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, শিক্ষক জন্নাতুল ফেরদৌসের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘জান্নাতুল ফেরদৌসের অনুপস্থিতি চারুকলা বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’ উপাচার্য শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার আত্মার শান্তি কামনা করেন।

ভোট গণনায় বিলম্বে ক্ষোভ

বৃহস্পতিবার বিকালে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও ৩২ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও গণনা শেষ হয়নি। নির্বাচন কমিশন স্বীকার করেছে, প্রার্থীদের আপত্তির কারণে ওএমআর মেশিন বাদ দিয়ে হাতে গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ বিলম্ব হয়েছে।

তবে শিক্ষক ও ছাত্রনেতারা এ বিলম্বে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এভাবে দেরি হলে ক্যাম্পাসে অশান্তি দেখা দিতে পারে এবং স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা

তিন প্যানেলের আলটিমেটাম

এদিকে তিনটি প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনকে আলটিমেটাম দিয়ে আজ দিবাগত রাতের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ও হল সংসদের ফলাফল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা। দাবির প্রেক্ষিতে বাগছাস-সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম, স্বতন্ত্র প্যানেল স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন এবং ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট-এর জিএস প্রার্থী মাজহারুল ইসলামের সমর্থকরা কমিশনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

হল সংসদের ফলাফল শেষ, চলছে কেন্দ্রীয় গণনা

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২১টি আবাসিক হলের ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের ১০টি হলে মোট ১৫০টি পদে ৫৯টিতে কোনও প্রার্থী ছিল না এবং ৬৭টিতে একক প্রার্থী থাকায় শুধু ২৪টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।

অন্যদিকে, জাকসুর ২৫টি পদের ভোট গণনা এখনও চলছে। এবারের নির্বাচনে মোট ১৭৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এর মধ্যে ভিপি পদে ৯ জন এবং জিএস পদে ৮ জন।

ভোটার উপস্থিতি

প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, মোট ১১,৭৪৩ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ৬,১০২ জন পুরুষ এবং ৫,৮১৭ জন নারী শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে কড়া নিরাপত্তা

জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাস ও আশপাশে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রায় ১৫০০ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি র‍্যাব ও বিজিবির ১০টি প্লাটুন মোতায়েন আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ও ভোটকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থায় আছে।

সম্ভাব্য ফল ঘোষণা

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অনানুষ্ঠানিকভাবে আজ শুক্রবার দিবাগত রাতে কেন্দ্রীয় ফলাফল ঘোষণা করা হতে পারে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রক্রিয়াটি শনিবার সকাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব এ কে এম রশিদুল আলম বলেন, ‘আমরা কিছু প্রাথমিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। তবে আশা করছি, আজ রাতের মধ্যেই গণনা শেষ হবে। জাকসুর ভোটে প্রতিটি ভোটারকে তিনটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়েছিল। ফলে অন্তত ২৫ হাজার ব্যালট পেপার গণনা করতে হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব ফলাফল ঘোষণা করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে গণনায় অগ্রগতি হয়েছে।’