জাহাঙ্গীরনগরের বাজেটে রাজস্ব ঘাটতি ১০০ কোটি, এবার গবেষণায় বরাদ্দ শূন্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। তবে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রাজস্ব বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর তথ্য তুলে ধরেছে প্রশাসন। 

শনিবার (২৭ জুন) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে অনুষ্ঠিত ৪৩তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আবদুর রব বাজেট উপস্থাপন করেন।

বাজেটের বড় অংশ বেতন-ভাতায়, গবেষণায় বরাদ্দ নেই

অনুমোদিত বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ২০১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৫৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এই অর্থ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৮ কোটি ৩ লাখ টাকা (২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে সাধারণ সরবরাহ ও সেবা তথা প্রশাসনিক আনুষঙ্গিক ব্যয় খাতে।

এ ছাড়া পেনশন ও অবসর-সুবিধা খাতে ৩৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা (১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ), যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ে ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, অবকাঠামো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যানবাহন ক্রয়ে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহায়তায় ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে এবারের বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, গবেষণার প্রয়োজনীয় অর্থ পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।

রাজস্ব ঘাটতি  ১০০ কোটি ছুঁইছুঁই

সিনেটে উপস্থাপিত কোষাধ্যক্ষের প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে ব্যয় ও প্রাপ্ত বরাদ্দের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে।

২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সঞ্চিত ঘাটতি ছিল ৬১ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৮০ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার টাকায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় মোট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। চলতি অর্থবছরের হিসাব যুক্ত হলে এ ঘাটতি শতকোটি টাকা অতিক্রম করবে বলে আশংকা অংশীজনদের।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ৪৪১ কোটি ১ লাখ ৬১ হাজার টাকার বাজেট চাইলেও ইউজিসি অনুমোদন দিয়েছে ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ ৫ হাজার টাকা। একইভাবে সংশোধিত বাজেটেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কোষাধ্যক্ষ বলেন, গবেষণা, শিক্ষার্থীসেবা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কল্যাণমূলক সুবিধা পরিচালনায় অর্থসংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি জাবি স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা, গবেষণা ভাতা, নৈশ ভাতা, গার্ড বোনাস, স্বাস্থ্য বীমা ভর্তুকি এবং ডাইনিং হলের অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতনের মতো ব্যয়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব তহবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট নিয়ে মতানৈক্য 

সিনেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড থিওলজি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক হয়।

সিনেট সদস্য ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী অভিযোগ করেন, একাডেমিক কাউন্সিলে কোরাম সংকটের মধ্যে গভীর রাতে সম্পূরক এজেন্ডা হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পরবর্তী একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত না হওয়ায় এটি সিনেটে উপস্থাপন করা উচিত হয়নি।

একই বিষয়ে সিনেট সদস্য ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন বলেন, নতুন বিভাগ বা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পূরক এজেন্ডায় আনা 'একাডেমিক ক্রাইম'-এর শামিল।

২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সপ্তম সমাবর্তন

সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সপ্তম সমাবর্তন আয়োজনের বিষয়ে তিনি সিনেট সদস্যদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

উপাচার্য আরও জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১২ হাজার ১৯৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এমফিল গবেষক ৯১৬ জন এবং পিএইচডি গবেষক রয়েছেন ৯৫৪ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭০৭ জন শিক্ষক, ৩৯২ জন কর্মকর্তা, ৯৯৮ জন তৃতীয় শ্রেণির এবং ৪৫৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কর্মরত আছেন।

বঙ্গবন্ধু হলের নাম পুনর্বহালের দাবি

সিনেট সদস্য ও ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি) বিভাগের অধ্যাপক শামীম কায়সার সিনেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পুনর্বহালের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

তিনি উপাচার্যের উদ্দেশে বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে নতুন বিভাগ চালুর আগে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন, আইআইটি ও আইবিএর অবকাঠামোগত সংকট নিরসন, বিভিন্ন অনুষদের নিজস্ব ভবন ও গবেষণা সুবিধা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।