ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ১৭ হাজার ১৬১টি গাছের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ গাছের তালিকায় বিদেশি প্রজাতির গাছের সংখ্যাই বেশি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্বোরিকালচার সেন্টারের পরিচালিত গাছশুমারিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
শুমারিতে ক্যাম্পাসে ৬২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ২৭৭ প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি গাছ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রজাতির হিসেবে ৫৮ শতাংশ দেশি এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি। তবে গাছের সংখ্যার হিসেবে দেশি ও বিদেশি গাছের অনুপাত যথাক্রমে ৫৪ ও ৪৬ শতাংশ।
ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বেশি থাকা ১৫টি প্রজাতির গাছের মধ্যে পাঁচটি বিদেশি। এগুলো হলো, মেহগনি (প্রথম), মাস্ট ট্রি (চতুর্থ), ম্যাকআর্থার পাম (অষ্টম), রেইন ট্রি (একাদশ) এবং সেগুন (ত্রয়োদশ)।
ক্যাম্পাসের গাছগুলোর মোট ভূ-উপরিস্থ জৈবভর (অ্যাবাভ-গ্রাউন্ড বায়োমাস) প্রায় ৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন, ভূগর্ভস্থ জৈবভর ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন এবং মোট কার্বন মজুত প্রায় ৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন।
ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের ২৫ শতাংশ গাছ ফলজ, ২২ শতাংশ বন্যপ্রাণীর আবাস ও খাদ্য সহায়ক, ২১ শতাংশ ঔষধি, ২০ শতাংশ কাঠ উৎপাদনকারী এবং ১২ শতাংশ সৌন্দর্যবর্ধনকারী।
১১টি সূচকের ভিত্তিতে গাছগুলোর স্বাস্থ্য মূল্যায়নে ১ হাজার ৮১১টি গাছে বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করার পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে ২ হাজার ২১৩টি গাছকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যেসব কারণে ঝুঁকিপূর্ণ
শুমারি অনুযায়ী, ২ হাজার ২১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ গাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১ হাজার ৫২টি গাছের মগডাল ভবন, দেয়াল বা অন্য স্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে রয়েছে। এতে অবকাঠামো ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া ৭২২টি গাছ বৈদ্যুতিক তারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। ৪০২টি গাছ ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে, ফলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেগুলো উপড়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ১৯টি গাছের শিকড় সড়কের ক্ষতি করছে এবং ১৮টি গাছ সড়কের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অন্যদিকে, পাঁচটি ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে সমস্যাগ্রস্ত ১ হাজার ৮১১টি গাছের মধ্যে ৫৬৯টির শিকড়ের বৃদ্ধি সড়ক বা দেয়ালের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ৫১৪টি গাছে পরগাছা শনাক্ত হয়েছে।
পোস্টার, ব্যানারসহ বিভিন্ন কারণে ১৫৯টি গাছে পেরেক লাগানো হয়েছে, যা গাছের জন্য ক্ষতিকর। ১২৫টি গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১১৩টির ডাল ভাঙা অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৯৯টি গাছের কাণ্ড দুর্বল, ৯৪টি গাছ মৃত এবং ৪৩টির ডাল ভঙ্গুর। এছাড়া ৭৭টি গাছ রোগ বা জীবাণুতে আক্রান্ত, ১৩টির শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত এবং পাঁচটি গাছের পাতার রঙ পরিবর্তিত হয়েছে।
যেসব এলাকায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ
আর্বোরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, ফুলার রোড এবং প্রক্টর অফিসসংলগ্ন আমতলা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ রয়েছে।
তিনি বলেন, নীলক্ষেতসংলগ্ন আর্চগেটের দুই পাশের মাস্ট ট্রি, ভিসি চত্বরের মাঝখানের রেইন ট্রির কয়েকটি ডাল, টিএসসি এলাকার সুপারি গাছ, ফার্মেসি গার্ডেনের ভেতরে মকররম ভবনের গেটসংলগ্ন নিমগাছ, কার্জন হল গেটের কাছে (ইইই বিভাগের সামনে) ইউক্যালিপটাস গাছ এবং কার্জন হল ভবনের বিপরীত পাশের ক্রিসমাস ট্রি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভেতরের কিছু অংশ, ফুলার রোডে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে থাকা কয়েকটি গাছ এবং মল চত্বরের পূর্ব পাশের সড়কসংলগ্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ যেকোনও সময় ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ঝুঁকিপূর্ণ গাছ ‘রক্ষা করা কঠিন’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২ হাজার ২১৩টি গাছকে বাঁচিয়ে রাখার বাস্তবসম্মত সুযোগ তিনি দেখছেন না।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলোকে রক্ষা করা খুবই কঠিন। কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অধিকাংশ গাছ এ অবস্থায় পৌঁছেছে। এগুলো বাঁচাতে হলে চারপাশের সব কংক্রিট সরিয়ে ফেলতে হবে। কারণ গাছের পুষ্টি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ছিদ্র বা বাকল টিস্যু বন্ধ হয়ে গেলে গাছ মারা যায়। কিন্তু এখন আমাদের সেই কংক্রিট অপসারণের সক্ষমতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের যা করার আছে, তা হলো ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো অপসারণ করে সেখানে নতুন গাছ লাগানো। এতে অন্তত সেসব গাছের শূন্যস্থান পূরণ করা সম্ভব হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আর্বোরিকালচার সেন্টার যেসব গাছকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলো কীভাবে অপসারণ করে নতুন গাছ লাগানো যায়; সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। তারা যেসব গাছ চিহ্নিত করেছে, তার মানচিত্র দিতে বলা হয়েছে। সেই মানচিত্র অনুযায়ী যেখানে গাছ সংরক্ষণ সম্ভব হবে, সেখানে তা করা হবে। আর যেখানে সম্ভব হবে না, সেখানে নতুন গাছ রোপণ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু গাছের কথা ভাবতে পারি না। আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’