রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সেশনজটে দীর্ঘ হচ্ছে শিক্ষাজীবন। চার বছরের স্নাতক শেষ করতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় বছর। কোনও কোনও বিভাগে এর চেয়েও বেশি সময় ধরে চলছে শিক্ষাজীবন। এক ব্যাচের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই যুক্ত হচ্ছে নতুন ব্যাচ; ফলে কোনও বিভাগে একই সময়ে ছয়টি, আবার কোনও বিভাগে সাতটি ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম চলছে।
নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ না হওয়া, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটসহ নানা কারণে দীর্ঘ হচ্ছে এই সেশনজট।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রমের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশির ভাগ বিভাগেই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বেশি ব্যাচ একসঙ্গে পড়াশোনা করছে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাতটি বিভাগের মধ্যে অর্থনীতি, সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে বর্তমানে সাতটি করে ব্যাচের কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, পপুলেশন সায়েন্সেস এবং শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে ছয়টি করে ব্যাচ। কলা অনুষদের ইংরেজি, ফোকলোর, ইতিহাস, সংস্কৃত এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগেও ছয়টি করে ব্যাচ রয়েছে। উর্দু বিভাগে ব্যাচের সংখ্যা ছয় থেকে সাতটি এবং নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে সাতটি।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সাতটি ব্যাচের পাশাপাশি মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স বিভাগে ছয়টি করে ব্যাচ চলছে। বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত বিভাগে রয়েছে ছয়টি করে ব্যাচ। একই সংখ্যক ব্যাচ নিয়ে চলছে আইন অনুষদের আইন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগও।
জীববিজ্ঞান অনুষদের ফার্মেসি বিভাগে ছয়টি ব্যাচ রয়েছে। এ ছাড়া জিওলজি অ্যান্ড মাইনিং, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও মনোবিজ্ঞান বিভাগে সাতটি করে ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইআর) সাতটি ব্যাচের কার্যক্রম চলছে। কৃষি অনুষদের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্স বিভাগে সাতটি এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ছয়টি ব্যাচ রয়েছে।
এছাড়াও চারুকলা অনুষদের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র; মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য এবং গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পের ইতিহাস—তিন বিভাগেই সাতটি করে ব্যাচ রয়েছে। এসব বিভাগে একই ধরনের একাধিক শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। ফলে একই সময়ে একাধিক ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বিভাগগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ২০২১ সালের শেষের দিকে ক্লাস শুরু করেন। চার বছর মেয়াদি স্নাতক ও পরবর্তী স্নাতকোত্তরের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলতি বছরের শেষ নাগাদ তাদের স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিভাগে তারা কেবল স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেছেন। এমনকি কয়েকটি বিভাগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও এখনও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত।
একই চিত্র ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ক্ষেত্রেও। ওই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ২০২২ সালের শেষ দিকে ক্লাস শুরু করেন। একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলতি বছর তাদের স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিভাগে তারা এখনও চতুর্থ বর্ষের শুরু কিংবা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও অধ্যয়নরত। আগামী জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন ব্যাচ যুক্ত হওয়ার সময় পুরোনো ব্যাচগুলোর কার্যক্রম চলমান থাকায় বিভাগগুলোতে একই সময়ে একাধিক শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীর চাপ তৈরি হচ্ছে।
সময়মতো কারিকুলাম প্রণয়ন না করা, কার্যকর একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অভাব, অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়হীনতার পাশাপাশি সেমিস্টার পদ্ধতিকেও সেশনজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের বিভাগে প্রায় এক দশক আগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়। এ পদ্ধতিতে একটি সেমিস্টারের ক্লাস, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক বিভাগেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব একাডেমিক কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সেমিস্টার পদ্ধতির অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কলা অনুষদের বিভাগগুলোতে চার ক্রেডিট বা ১০০ নম্বরের একটি কোর্সের জন্য ৬০টি ক্লাস বা ক্রেডিট ঘণ্টা রয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে তিন ক্রেডিট বা ১০০ নম্বরের একটি কোর্সের জন্য ক্লাসের সংখ্যা ৪২টি। নিয়ম অনুযায়ী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ক্লাস শেষ করার কথা। এরপর পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার কথা।
পরবর্তী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করার বিধান রয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ফল প্রকাশ করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে ক্লাস শেষ করা, পরীক্ষা নেওয়া কিংবা ফল প্রকাশের যেকোনো একটি ধাপে বিলম্ব হলে পরবর্তী ধাপও পিছিয়ে যায়। একটি সেমিস্টারের বিলম্বের প্রভাব পড়ে পরবর্তী সেমিস্টারে। এভাবে একের পর এক একাডেমিক কার্যক্রম পিছিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও দীর্ঘ হচ্ছে।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আক্তার বানু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেমিস্টার পদ্ধতির কারণে ছয় মাসের মধ্যে একটি সেমিস্টার শেষ করে পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। একটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী পরীক্ষার সময় চলে আসে। ফলে শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নেওয়া ও পরীক্ষা গ্রহণ—দুই কাজই অত্যন্ত চাপের মধ্যে করতে হয়।’
আক্তার বানু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের পেছনে শিক্ষক সংকট একটি বড় কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন অনেক বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। আমার বিভাগেই বর্তমানে শিক্ষক সংকটের কারণে একসঙ্গে এতগুলো ক্লাস ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘একই সময়ে ছয় থেকে সাতটি ব্যাচের ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে অনেক বিভাগকে। এর সঙ্গে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট, যা সেশনজটেও প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। অনেক বিভাগই তিন থেকে চারটি শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’
অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় একটি ব্যাচের ক্লাস চলাকালে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। এতে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া ব্যাহত হয়।’
সেশনজট নিরসন ও শ্রেণীকক্ষ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সেশনজট শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে একাডেমিক শাখা-১ ও উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) দফতরের সমন্বয়ে কাজ চলছে। ২০২৪ সালের বকেয়া ফলাফল প্রকাশে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে একাধিকবার চিঠি ও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আমরা সেশনজটকে শূন্যের কোটায় নিয়ে আনতে চাই।
তিনি বলেন, ‘এর লক্ষ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। পরীক্ষার সময়সূচি, খাতা জমা ও ফল প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে খাতা জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ডিফল্টার হিসেবে গণ্য করা হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফল প্রকাশে বিলম্ব কমবে।’