খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীদের মাদক সংশ্লিষ্টতায় তিন ছাত্রকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর মাদক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে করে ফেসবুকে নেতিবাচক পোস্ট হয়। এ পোস্টকে কেন্দ্র করে সজল নামের স্থানীয় এক যুবককে ক্যাম্পাসে ডেকে নিয়ে মারপিট করা হয়। ক্যাম্পাসের ভেতরে ওই যুবককে আটকে রাখার খবরে স্থানীয় অন্য যুবকরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় উভয়ের মধ্যে ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে সড়ক অবরোধ করা হয়। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পাশে হল রোডে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও শিক্ষকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের মাদক পরিস্থিতি ও হল রোডের কয়েকটি বাসায় অনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করেন সজল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র সজলকে মারতে মারতে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে সজলের বন্ধু ও স্থানীয়রা হল গেটে জড়ো হলে স্থানীয় এক মুরুব্বীকেও মারধর করে ছাত্ররা।
তবে ছাত্রদের পক্ষ থেকে লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তি ছদ্মনাম ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্টের বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে খাজা গেট এলাকায় ডাকে। এ সময় কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তির মদদে সেখানে একদল লোক জড়ো হয়। তারা ওই ব্যক্তিকে মারতে মারতে সেখান থেকে নিয়ে যেতে শুরু করে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তখন তাকে ফিরিয়ে এনে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি হামলা চালায় এবং তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে শিক্ষার্থীরা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কোনো হামলা শুরু হয়নি; বরং তাদের ওপর আক্রমণ ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমেই পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, পুলিশ ও শিক্ষকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। কী নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত খুঁজে বের করা হচ্ছে। ছাত্রদের হেফাজতে থাকা যুবককে হরিণটানা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উভয়পক্ষ আলোচনা করে শনিবার তাদের পদক্ষেপ জানাবেন।
স্থানীয়রা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উগ্র আচরণে আশপাশের বাড়ির মালিকরা অতিষ্ঠ। তুচ্ছ কারণে স্থানীয়দের মারধরসহ প্রায় এমন ঘটনা ঘটছে। বিষয়টির স্থায়ী সুরাহার দাবি জানান তারা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক কর্মীদের হামলা শিরোনামে এক বিবৃতিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ছদ্মনাম ব্যবহার করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে জড়িয়ে একটি আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট প্রকাশ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্য করে। একইসঙ্গে সে নিজেকে বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়। পরে তার পরিচয় ও দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টির সত্যতা জানতে এবং পোস্টটির ভিত্তি সম্পর্কে কথা বলতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে খাজা গেট এলাকায় ডাকে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি নিয়ে কথা বলা এবং পোস্টটির সত্যতা জানা। কোনও ধরনের সংঘর্ষে জড়ানো নয়। ঘটনাস্থলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক সংক্রান্ত কথোপকথন ও বার্তার তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে মাদক সংক্রান্ত লেনদেন ও যোগাযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত এবং তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যও সামনে আসে। এরপর এ এলাকার কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মদদে সেখানে একদল লোক জড়ো হয়। তারা নিজেরাই আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করার কথা বলে ওই ব্যক্তিকে মারতে মারতে সেখান থেকে নিয়ে যেতে শুরু করে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তখন তাকে ফিরিয়ে এনে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা জানায়। কিন্তু তা না করে বরং শিক্ষার্থীদের ওপরই হাত তোলা হয়। একপর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মদদে আরও লোকজন জড়ো হয়ে খাজা গেট এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি হামলা চালায় এবং তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে শিক্ষার্থীরা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কোনও হামলা শুরু হয়নি; বরং তাদের ওপর আক্রমণ ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমেই পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনার ভিডিওচিত্র আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং এই পোস্টের কমেন্ট বক্সে তা প্রকাশ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেলে হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সরে যায়। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হয়ে সংঘাতে যায়নি। একটি আপত্তিকর পোস্টের সত্যতা জানতে গিয়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় হামলার শিকার হয়েছে তারা। মাদক সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পরও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কাউকে রক্ষা করার কোনও চেষ্টা থাকলে, তার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হাত তোলা এবং তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের এ ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। শিক্ষার্থীদের ওপর এমন হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উল্লেখ, মাদকদ্রব্যসহ আটক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের তিন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় সাময়িক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের কাজী রিয়াজুস ছলেহীন, এস এম তৌফিক আলম ও মো. মুশফিক উল ইসলাম।
বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক দপ্তরের নিয়মিত টহল কার্যক্রমের সময় ৪ নম্বর একাডেমিক ভবনে ওই তিন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। পরে তাদের তল্লাশি করে মাদকদ্রব্য (গাঁজা) পাওয়া যায় বলে ছাত্রবিষয়ক পরিচালক দপ্তরের সদস্যরা দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শৃঙ্খলা অধ্যাদেশের ৬(খ) ও ২৪ ধারা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালক এহসান মজিদ মোস্তফাকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, নিয়মিত টহল কার্যক্রমের সময় তিন শিক্ষার্থীকে আটক করে তাদের সাথে মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পরে শৃঙ্খলা কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।