নিজামীর নির্দেশেই বুদ্ধিজীবী হত্যা: চোখের জলও শুকিয়ে গেছে

নিজামীজামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশেই ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এ ক্ষত না শুকালেও চোখের জল শুকিয়ে গেছে। বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেন, কিভাবে বিজয়ের আগে আগে দেশের সূর্যন্তানদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বদরবাহিনী। আর নিয়ে যাওয়ার সময় তারা বলেছিলেন নিজামীর নির্দেশেই তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ট্রাইব্যুানালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় শহীদ চিকিৎসক আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, যারা বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা আমাকে বলেছিলেন, নিজামীর নির্দেশে এসেছি। আমি জানতে চেয়েছিলাম, কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা বলেছেন, আমাদের নেতা নিজামীর নির্দেশে নিয়ে যাচ্ছি। এদিকে, শহীদ বুদ্ধিজীবী চিকিত্সক আজহারুল হকের স্ত্রী সৈয়দা সালমা হক ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দিতে বলেন, নিজামীর নির্দেশে একাত্তরের ১৫ নভেম্বর তার স্বামী আজহারুল হক ও চিকিত্সক হুমায়ুর কবীরকে আলবদরা ধরে নিয়ে হত্যা করেন।
বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ সালমা হক ও শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী যখন জবানবন্দি দিচ্ছিলেন, তখন আসামির কাঠগড়ায় নিজামী উপস্থিত ছিলেন।
বধ্যভূমিশ্যামলী নাসরিন বলেন, ৪৫ বছর আমরা কষ্টে কাটিয়েছি। মুখ বুজে সহ্য করেছি। কবে এই আলবদরদের শাস্তি হবে। যে নৃশংসভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। চোখের চিকিৎসকের চোখ তুলে নেওয়া, হৃদরোগের চিকিৎসকের হার্ট খুবলে নেওয়া, যারা দেখেননি, তারা বিশ্বাসও করতে পারবেন না।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পরে ডা. আলীমকে অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। ১৭ তারিখ জানতে পারেন, যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারা কেউ বেঁচে নেই। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অনেক লাশ পড়ে আছে শুনে আলীম চৌধুরীর ছোট ভাই হাফিজ চৌধুরী, চেম্বার সহকারী হাকিম ও মোমিনসহ অন্য আত্মীয়স্বজনরা সেখানে গিয়ে তার লাশ বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে তারা ডা. ফজলে রাব্বী, সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের লাশও খুঁজে পান। সারাশরীরে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানোর চিহ্ন। অসংখ্য গুলিতে বুক ঝাঁঝরা ছিল।
আরও পড়ুন: প্রাণভিক্ষা বাকি, ফাঁসি কার্যকরে বাধা নেই


শহীদ সেলিনা পারভীনের লাশ

শ্যামলী নাসরিন জানান, ১৯৭১ সালে ২৯/১ পুরানা পল্টনের বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। সঙ্গে থাকতেন স্বামী, দুই মেয়ে, অসুস্থ বাবা-মা, ছোট বোন এবং দুভাই। এদুই ভাই পরে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। একাত্তরের জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে মাওলানা মান্নান (দৈনিক ইনকিলাবের মালিক) আশ্রয় নিতে যান। ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসের ২/৩ তারিখ থেকে দেখতে পাই ছাই রংয়ের প্যান্ট ও নীল রংয়ের শার্ট পরা কিছু যুবক অস্ত্র হাতে পুরোবাড়ি পাহারা দিতে থাকেন। ডাক্তার আলীম চৌধুরী মাওলানা মান্নানকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন মান্নান নিজে আলবদরের সংগঠক এবং ওই যুবকরা আলবদর সদস্য।


শ্যামলী নাসরিন বলেন, ১৫ ডিসেম্বর কটি গাড়ির শব্দ শুনতে পেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই কাদামাখানো একটি মাইক্রোবাস মাওলানা মান্নানের গেটে এসে দাঁড়ায়। ৩০-৩৫ মিনিট পর দেখি আমাদের দরজার বাইরে থেকে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। এ সময় তারা দরজা খুলতে বলছেন। আমি ওপরের জানালা দিয়ে দেখলাম অস্ত্র হাতে দুই/তিনজন আলবদর দরজায় লাথি দিচ্ছেন। আমার স্বামী মান্নানের দরজায় ধাক্কা দিলে তিনি দরজা সামান্য ফাঁক করে বলেন, ‘আপনি যান, আমি আছি’। আমার স্বামী আবার ওপরে উঠতে চাইলেও পারলেন না। ততক্ষণে আলবদর সদস্যরা ভেতরে ঢুকে পড়েন। এবং ‘হ্যান্ডস আপ’ বললে আমার স্বামী তাদের বলেন, কী ব্যাপার? তারা তখন বলেন, সেটা আপনি গেলেই জানতে পারবেন। এটা আলবদরের হাইকমান্ড নিজামীর নির্দেশ। এরপর তাকে চোখ বেঁধে বের করে নিয়ে যান।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডআরও পড়ুন: চূড়ান্ত বিচারে নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল
জবানবন্দিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী আজহারুল হকের স্ত্রী সালমা হক আরও বলেন, ১৯৭০ সালে বিয়ের পর তারা ২২ নম্বর ফ্রি স্কুল স্ট্রিট হাতিরপুলে ভাড়া থাকতেন। ওই সময় তার স্বামী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার স্বামী ২৫ মার্চ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত ওই ফার্মেসিতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সাসেবা দেন।
একাত্তরের ১৫ নভেম্বর ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে তার স্বামী হাসপাতালে যাওয়ার জন্য অ্যাপ্রোন আনতে বাসার কাজের ছেলে শাহাদাতকে লন্ড্রিতে পাঠান। এর কিছুক্ষণ পর শাহাদাত খালি হাতে ফিরে এসে জানান, পাকিস্তানি সেনা ও কিছুসংখ্যক সশস্ত্র বাঙালি তাদের এলাকা ঘিরে রেখেছে। এ কথা শুনে তার স্বামী বাড়িওয়ালার বাসা থেকে হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বলেন। ওই সময় সামনের ভবনে বসবাসকারী চিকিত্সক হুমায়ুন কবীরও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বাসার নিচে নেমে আসেন। কিছুক্ষণ পর বাসার কাজের ছেলে তাকে খবর দেন যে, তার স্বামী ও হুমায়ুন কবীরকে পাকিস্তানি সেনা ও অস্ত্রধারীরা ধরে নিয়ে যাচ্ছেন।
সালমা হক, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীই কেবল নন, প্রতিটি শহীদ পরিবারের অপেক্ষা ছিল কবে দেশ রাজাকারমুক্ত হবে। বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যার মাধ্যমে যারা দেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিলেন, তাদের গত ৪৫বছরে বিচারের মুখোমুখি করতে না পারায় তাদের কষ্ট জমে ছিল। ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হলে তারা আশায় ছিলেন আজকের দিনের।

/এমএনএইচ/