বিএনপি-জামায়াত আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল: শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা‘সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বিশেষ করে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলার প্রতিবাদে ২১ আগস্ট শান্তির সমাবেশ করতে এসেছিলাম। বক্তৃতাও শেষ হয়েছে। তখন ফটো সাংবাদিকরা বললেন, আপা ছবি পাইনি। এর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে একের পর এক গ্রেনেড হামলা। আমার পাশে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ভাই মানবঢাল তৈরি করে আমাকে রক্ষা করেন।’

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার মুহূর্ত স্মরণ করে এভাবেই বর্ণনা দেন তিনি। গ্রেনেড হামলার শহীদদের স্মরণে  গতবছর ২১ আগস্ট  কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আয়োজনে এক সভায় তিনি বলেন, ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

১২ বছর আগে ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেদিনের ওই ভয়াবহ হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ নেতা-কর্মী নিহত হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা। কিন্তু শারিরীক ও মানসিকভাবে আহত হন তিনিও।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে,সারা দেশে জঙ্গিদের বোমা হামলার প্রতিবাদে সেদিন বিকেলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক শান্তি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান যখন, তখন বিকেল ৫টা। একটি ট্রাকের ওপর তৈরি করা মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। এরপরই ঘটে গ্রেনেড হামলার ঘটনা।

ঘটনার দিন চোখের সামনে নেতাকর্মীদের লাশ আর রক্তবন্যা দেখে হতবিহ্বল জননেত্রী শেখ হাসিনা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পরের দিনের পত্রিকায় প্রকাশিত তার ছবি এর বড় প্রমাণ। তিনি সেদিন ঘটনাক্রমে বেঁচে গেলেও কাছের নেতাকর্মীদের হারিয়েছেন, হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের সাথী আইভী রহমানকে। যখন নেতাকর্মীরা বাঁচাতে মানবঢাল তৈরি করে এবং তাকে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে, তখনও জানেন না কী ভয়াবহতা ঘটে গেছে। যারা হাসপাতালে গিয়েছিলেন সেইদিন তারা আগে কখনও এমন বিভৎসতা দেখেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের স্মরণসভায় বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে, আর দেশের মানুষের শান্তি চায়। কিন্তু যখনই আওয়ামী লীগ দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যায় তখনই বিএনপি গণতন্ত্রের নামে হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়।

স্মরণ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২১ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে খালেদা জিয়া ও তার কুলাঙ্গার ছেলে তারেক রহমান জড়িত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই ভয়াবহ হামলার বিচার চলছে। আশা করি, প্রকৃত অপরাধীরা উপযুক্ত সাজা পাবে। এটা অবশ্যই হতে হবে। নইলে দেশে সন্ত্রাস বাড়তে থাকবে।

তিনি বেদনাতুর হয়ে স্মরণ করেন সেদিনের বিভৎসতা। বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততা বুঝতে কঠিন হয় না, যখন কিনা হামলার শিকার মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আর বাকিরা বাঁচার তাগিদে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, তখনই ছোড়া হলো কাঁদুনে গ্যাস। প্রধানমন্ত্রী সেদিনের অভিজ্ঞতার নির্মমতা বর্ণনায় বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য ছিল খুনিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা।’

দেশের সন্ত্রাস যাতে আর না বাড়ে সেজন্য এর বিচার অবশ্যই হতে হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তখন বিএনপি ক্ষমতায়। আলামত রক্ষা করা তো দূরের কথা সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে আলামত দ্রুত নষ্ট করে। ... দুটো গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়নি, সেগুলো সংরক্ষণ না করে নষ্ট করে দেয়।’

সেই সময় সরকারে থাকা এ দলটির নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে নিজে নিজেকে মেরেছি। কি ন্যক্কারজনক! যে গ্রেনেড যুদ্ধে ব্যবহার হয়, সেই গ্রেনেড আমাদের সভায় ছুড়ে মেরে হত্যা করা হয়। ওই হামলায় যারা জড়িত ছিল তাদের দেশের বাইরে চলে যেতে সহায়তা করেছিল তখনকার সরকার। সাজায় জজ মিয়া নাটক।

পরবর্তীতে হামলাকারীদের নেতৃত্বদানকারী জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যে বেরিয়ে আসে, ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট হাওয়া ভবনে (বিএনপির তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে পরিচিত) আলোচনায় বসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভূমি উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একজন (মেজর নূর), জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামির (হুজি) দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও জঙ্গি সংগঠন আল মারকাজুল ইসলামির এক নেতার উপস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে চিরতরে শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়।

আরও পড়ুন- 
টার্গেট শেখ হাসিনা, ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে দফায় দফায় সভা

শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয় যেভাবে

/এপিএইচ/আপ-এফএস/