শিশু পর্নোগ্রাফি: মূল হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

পর্নোগ্রাফি তৈরির সরঞ্জাম

বছরের পর বছর ধরে মামলা হলেও পর্নোগ্রাফি ব্যবসার মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এই কারণে অনেক ব্যবসায়ী আটক হলেও নতুন নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে এবং উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে না। পর্নোগ্রাফি ছড়িয়ে দিতে যারা সহায়তা করছেন, তাদের শিকড়ের অনুসন্ধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাও দিন দিন এর উৎপাদন সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। আর সমাজ গবেষকরা বলছেন, পর্নোগ্রাফির কারণে বাড়ছে অনৈতিক যৌন লালসা, আর তার শিকার হচ্ছে শিশুরা ।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পর্নোগ্রাফি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে আটক হওয়া, বা বিচারের মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের তদন্তের ক্ষেত্রে কোনও মামলাতেই মূল হোতাদের ধরা বা চিহ্নিত করার কোনও উদাহরণ নেই এখনও পর্যন্ত।


টিপু কিবরিয়া২০১৪ সালের ১০ ও ১১ জুন খিলগাঁও, মুগদা এবং গোড়ানে অভিযান চালিয়ে টিপু কিবরিয়া এবং তার তিন সহযোগী নুরুল আমিন, নুরুল ইসলাম ও সাহারুলকে গ্রেফতার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম টিম। স্টুডিওতে আপত্তিকর অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১৩ বছরের এক শিশুকে। তখন টিপুর খিলগাঁওয়ের তারাবাগের বাসা ও স্টুডিও থেকে শতাধিক পর্নো সিডি, আপত্তিকর শতাধিক স্থির ছবি, ৭০টি লুব্রিকেটিং জেল, ৪৮ পিস আন্ডারওয়ার, স্টিল ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, কম্পিউটার হার্ডডিস্ক, সিপিইউ, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মুগদা থানায় মামলা হয়েছে। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে নেওয়া হয় তিন দিনের রিমান্ডে। রিমান্ড শেষে ১৫ জুন টিপু কিবরিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। নির্যাতিত ওই শিশুটিসহ অন্যরাও জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

মামলায় দুবছর পর দুইটি সাক্ষ্য হয়েছে। এ মাসে মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে তারা, যে বিদেশিদের প্ররোচনায় টিপু তার ব্যবসা ফেঁদেছিল। টিপু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি পর্নো ছবি তৈরি করে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের তিন ব্যক্তির কাছে পাঠাতেন। এদের একেকজনের কাছ থেকে প্রতি মাসে তিনি ৫০ হাজার করে দেড় লাখ টাকা পেতেন।

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির হোমিসাইডাল স্কোয়াড ফর অর্গানাইজড ক্রাইম এর শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলাটিতে মূল হোতা হিসেবে টিপু কিবরিয়াকেই দেখানো হয়েছে।’ টিপু তার জবানবন্দিতে যে জার্মান ও সুইজারল্যাণ্ডের জড়িতদের নাম বলেছেন তাদের বিষয়ে কোনও খোঁজ তদন্তকালে নিয়েছিলেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, সেটা দরকার হয়নি বিধায় নেওয়া হয়নি। এই পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে টিপু কিবরিয়াই জড়িত ছিল।’

পর্ণোগ্রাফিএদিকে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড (ডিএসইউ) নামের গ্রুপটির তিনজনকে আটক করার পর জানা যায়, এদের মোট ১৮ জন অ্যাডমিন ও একজন ক্রিয়েটর রয়েছে। তাদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় বসে প্রবাসী বাংলাদেশি  মো. রাহুল চৌধুরী এই গ্রুপটির ক্রিয়েটর হিসেবে তদারকি করছে। পর্নোগ্রাফি ছড়ানো, অশ্লীল আলাপচারিতাসহ এমন কোনও নোংরামি নেই, যা এই গ্রুপে প্রচারিত হয় না। এই রাউল চৌধুরী ছাড়া  তদন্তে খুব বেশি কিছু বের করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে মাস্টারমাইণ্ড যারা তাদের ধরা না গেলে, সেই অপরাধ বন্ধ হয়েছে এটা ভাবা ঠিক হবে না। কারণ, তারা নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করে তাদের কাজ পরিচালনা করবে সেটাই স্বাভাবিক।’
তিনি বলেন, ‘ প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল উৎপাটন না করে যাকে ধরা হচ্ছে, তদন্ত তার আশপাশ দিয়েই ঘুরছে। এটা অপরাধ নিরসনের জন্য ভাল কৌশল না। তবে নিয়মিত এই মধ্য সারির সম্পৃক্তদের ধরাটাও গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মাধ্যমেও শেকড়ে পৌঁছানো যেতে পারে ।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন পর্নোগ্রাফিতে শিশুদের ওপর চলমান যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রসঙ্গে  বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহারের সঙ্গে পর্নোগ্রাফি জড়িত।পর্নোগ্রাফির কারণে বাড়ছে অনৈতিক যৌন লালসা। আর তার শিকার হচ্ছে শিশুরা- সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে যাদের অবস্থান তলানিতে।’ এর প্রতিকারে কী ধরনের পদক্ষেপ জরুরি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শুধু রোগীর নয়, রোগের চিকিৎসাটা জরুরি এবং আমাদেরকে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অভিভাবকের অভিভাবকত্ব বিষয়ে আরও বেশি করে কথা বলতে হবে।’
/ইউআই  /এপিএইচ/
আরও পড়ুন: ‘১৬টা দিন কীভাবে পার হয়েছে আমি বলতে পারবো না’