অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় পাহাড়ে রাজত্ব চালিয়ে আসছে প্রভাবশালী এসব চক্র। সরকারি দল-বেসরকারি দলের প্রভাব-প্রতিপত্তি নয়, পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ফলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পাহাড়ে তাদের রাজত্বের কোনও পরিবর্তন হয় না। যুগের পর যুগ টিকে থাকে তাদের আধিপত্য।
মতিঝরনা পাহাড়ে বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রিকশাচালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রভাবশালী একটি চক্র রয়েছে, যারা পাহাড়ে জায়গা দখল করে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে। স্থানীয় কাউন্সিলরসহ রাজনৈতিক নেতারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। টাকা দিলে তারা এখানে ঘর তোলার অনুমতি দেয়।’ দুই রুমের একটি ঘর তোলার অনুমতি নিতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা এই চক্রকে দিতে হয় বলে জানান তিনি।
একই পাহাড়ের আরেক বাসিন্দা কুমিল্লার আক্তার হোসেন বলেন, ‘টাকা দিয়ে ঘর তোলার অনুমতি নিলেও অনেক সময় সেই ঘরে থাকতেও দেওয়া হয় না। ঘর তোলার পর তা জোর করে দখল করে সেখানে অন্যদের ভাড়া দেয় ওই প্রভাবশালী চক্রটি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ে ঘর তোলার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে হয়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুমতি ছাড়া এখানে কিছুই করা যায় না।’
এ কে খান পাহাড় ও মতিঝরনা এলাকায় বসবাসকারী একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মতিঝরনা এলাকায় একটি রুমে থাকার খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। আর দুই রুমের খর তিন থেকে চার হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে সরকারি ছয়টি সংস্থার মালিকানাধীন পাহাড় রয়েছে সাতটি। অবৈধ দখলে রেখে সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র এসব পাহাড় থেকে ভাড়ার নামে প্রতি মাসে আয় করছে ৫০ লাখ টাকারও বেশি।
অবৈধ দখলে থাকা সাতটি পাহাড়ের মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতরের মালিকানায় রয়েছে আমবাগান এলাকার বাটালি হিল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মালিকানায় রয়েছে টাইগার পাসের মোড়ে ইন্ট্রাকো সিএনজির পেছনের পাহাড়, লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়, বিশ্ব কলোনি বড় পানির ট্যাংকির পাহাড় ও ওয়াসার মতিঝরনা পাহাড়। বাকি পাহাড়গুলোর মালিকানা রেলওয়ের।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল জলিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাহাড়গুলো যেসব সংস্থার মালিকানায় রয়েছে, তাদের কোনও তৎপরতা না থাকায় দখলদারিত্ব বাড়ছে। মালিকরা উদ্যোগ না নিলে সেখানে আমাদের করার কিছু থাকে না। এরপরও পাহাড় ধসে জান-মালের ক্ষতি এড়াতে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।’ পাহাড়ের দখলদারদের উচ্ছেদে সরকার, রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক কামাল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার ছিল, প্রশাসন তা করতে পারেনি। এ কারণেই পাহাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। পাহাড়কে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে অপব্যবহার করেছি, করছি আমরা। তাই প্রকৃতি আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।’
আরও পড়ুন-
ন্যাড়া আর খোঁড়া পাহাড়ই ধসে পড়ছে
পাহাড় ধসে চার জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৬
ধসে পড়া পাহাড়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানোই কঠিন
পাহাড় ধস: আহতদের চিকিৎসায় ৪৮৩ মেডিক্যাল টিম
দুর্নীতি বন্ধ না হলে থামবে না পাহাড় ধস, মৃত্যুর মিছিল
/টিআর/টিএন/