অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ, পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) শাহ আলম, পুলিশের মানবপাচার প্রতিরোধ মনিটরিং সেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুরা বেগম, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল মারুফ, প্রবাসে ভুক্তভোগী ইলিয়াস হোসেন, আল আমিন নয়ন প্রমুখ।
ভুক্তভোগী ইলিয়ান হোসেন আলোচনা সভায় নিজের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই ২০১১ সালে আবুধাবি গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, সেখানে তাকে বেতন না দিয়ে ওমান নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ইরানে নিয়ে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
তিনি বলেন, ‘‘আমাকে কাজের কথা বলে ইরানে নিয়ে আটকে রাখা হয়। এরপর মুক্তিপণ দাবি করে পাচারকারীরা। বাংলাদেশে আমার পরিবার ৭ লাখ দিলেও তারা আমাদের ছেড়ে দেয় না। পরে এক সময়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসি। ইরানি পুলিশকে জানালে, তারা আমাদের পাকিস্তান সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। পরবর্তীতে ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে দেশে ফিরি। দেশে ফিরে মামলা করলেও কোন প্রতিকার পাইনি। পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা বারবার শুধু আমাকেই ডাকেন, ‘বলেন আমি কেন মামলা করলাম? তারা (পাচারকারী) তো ভালো লোক।’ রাগে দুঃখে মামলার সব কাগজ ছিড়ে ফেলে দিয়েছি।’’
অনুষ্ঠানে মানবপাচারে রিক্রুটিং এজন্সিগুলোকে দোষারোপ করেন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) উপ পরিচালক আবদুল্লাহ আল মারুফ। তিনি বলেন, এজেন্সিগুলোকে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। এজেন্সিগুলো বিদেশগামীদের কোনও তথ্য সংরক্ষণ করে না। সঠিক নিয়ম মানে না। বিদেশে গিয়ে কোন কর্মী বিপদে পড়েছে কিনা তাও মনিটরিং করে না।
পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) শাহ আলম বলেন, অনেকেই বিদেশে জিম্মি করে দেশে টাকা আদায় করা হচ্ছে। কাদের মাধ্যমে, কিভাবে টাকা আদায় হচ্ছে সেটি চিহ্নিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, না হলে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে মোকাবিলা করে ভুক্তভোগীর টিকে থাকা কঠিন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, এটা সত্যি আমাদের দেশে থেকে মাইগ্রেশন খরচ অনেক বেশি। বেশি খরচ দিয়ে বিদেশে গিয়ে টাকা না উঠায়, অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অবৈধ ভাবে থেকে যান। মাইগ্রেশনের খরচ কমানো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, অনেকে স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিটিং ভিসা, চিকিৎসার নাম করে বিদেশে গিয়ে থেকে যান। তাই তাদের ঠেকানোর জন্য সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিমানবন্দরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকজন কাজ করে, সেখানে যদি বিষয়গুলো নজর দেয় তবে কাজটা আর সহজ হবে। মানবপাচার রোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ না করে তাহলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘পাচারকারীরা অনেক বেশি শক্তিশালী। এ কারণে এখন পর্যন্ত মূলহোতাদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি।এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতাও চোখে পড়ার মতো।’
তিনি আরও বলেন, যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাদের অনেকেই বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেসময় অনেক বাংলাদেশিও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিশে সে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
মানবপাচাররোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি বলেন, সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।
মানবপাচারের তদন্ত প্রক্রিয়ার সমালোচনাও করেন কাজী রিয়াজুল হক। তিনি বলেন, বিচারের জন্য তদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
তিনি মানবপাচারে যুক্ত ‘গডফাদার’দের তালিকা তৈরিসহ তাদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।
আরও পড়ুন-
লিসা কার্টিসের ঢাকা সফর স্থগিত
উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে ঢাবির সিনেট অধিবেশন শুরু
বাতিল বলেও অভিজাত হোটেলে সম্মেলন করলো ইউনূস সেন্টার
/সিএ/টিএন/