‘কেউ জবাবদিহিতা এড়াতে পারবেন না’

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি (ছবি- সাজ্জাদ হোসেন)সুনির্দিষ্টভাবে রায়ের সমালোচনা হতে পারে, বিচারপতিদের নিয়েও সমালোচনা হতে পারে। সেটা কাউকে অসম্মান করে নয়। আর প্রত্যেকেরই জবাবদিহিতার জায়গাটি থাকতে হবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারকদের সেই জবাবদিহিতার জায়গাটি নিশ্চিত করতে পারেনি। বিচারকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে— এমন নজির নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কেউ জবাবদিহিতা এড়াতে পারবেন না।
বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) বিকালে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে আয়োজিত ‘সংবিধান, সংসদ ও স্বাধীনতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে বক্তারা এসব কথা বলেন।
মুন্নী সাহা (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)মুন্নী সাহার সঞ্চলনায় বৈঠকিতে অংশ নেন সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী, সাংবাদিক স্বদেশ রায় ও বাংলা ট্রিবিউনের প্ল্যানিং এডিটর নজরুল কবীর।
বৈঠকির সূচনা বক্তব্যে সাবেক বিচারপতি মানিক বলেন, ‘আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ বলছে, এই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সেই অর্থে সংসদ অনেক বড় একটি বিষয়। কারণ সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। সংসদ দেশের রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি অন্যদের নিয়োগ দিচ্ছেন।’ বৈঠকিতে আলোচনার এক পর্যায়ে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি অনেকগুলো অমার্জনীয় বিষয় তুলে ধরেছেন। এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, সুপ্রিম কোর্টের নয়। সিনহা বাবু (প্রধান বিচারপতি) তার পর্যবেক্ষণে অনেক কাহিনি বলেছেন। রায়ের বাইরে গিয়ে তিনি যেসব কথা বলেছেন, সেগেুলো অত্যন্ত আপত্তিকর। আমাদের সংসদে অনেক জাঁদরেল পলিটিশিয়ান আছে। কিন্তু তিনি সবাইকে গড়ে ইমম্যাচিউর বলে দিলেন।’
সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘উনি (প্রধান বিচারপতি) আমেরিকার উদাহরণ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নাম বলেননি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলেছেন। যে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে না, তার এ দেশে বসবাসের কোনও অধিকার নেই।’ উচ্চ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ রেকর্ড হিসেবে থেকে যাবে উল্লেখ করে এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখলে কী জানবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘পার্লামেন্ট ম্যাচিউর কিনা, এটা বিচাররের দায়িত্ব তার নয়। সিনহা বাবু যা বলেছেন, সবই রাবিশ। উনি অন্যের এজন্ডো ক্যারি করছেন।’
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘আমি তার (প্রধান বিচারপতি) সঙ্গে এক বেঞ্চে তিন বছর ছিলাম। এটা সিনহা বাবুর ভাষা নয়। যে ভাষায় তিনি পর্যবেক্ষণ লিখেছেন, সেটা তার নিজের ভাষা নয়।’
আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট হলো কোর্ট অব রেকর্ড। রায়কে রাজনীতিকীকরণের প্রচেষ্টা দেখা গেছে। সুনির্দিষ্টভাবে আমরা রায়ের সমালোচনা করতে পারি। রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি না; সেটা হচ্ছে জবাবদিহিতা। আমার ৪৬ বছরে এমন কোনও উদাহরণ দেখাতে পারব না। সংবিধান অনুযায়ী আমরা রায় মানতে বাধ্য। অবজারভেশনও রায়ের একটি অংশ। কিন্তু একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিচার বিভাগের বিচারের জন্য। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এখন পর্যন্ত কোনও উদাহরণ তৈরি করতে পারেনি। অথচ দেশের দুই প্রধানমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। কিন্তু বিচারপতিদের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ আমরা দেখিনি। বিচারপতিরা কি তবে সব জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, ‘বিচারপতিদের কেউ কেউ সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন। কিন্তু এর জন্য তাদের কাউকে আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারিনি। আমাদের আদালত এখনও ঔপনেবিশক কায়দায় রয়ে গেছে। কোর্ট নিয়ে জুজুর ভয় কাজ করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকেই কিন্তু অ্যাকাউন্টেবল।’
এই অধ্যাপক বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধীন বাতিল করে জাতীয় সংসদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। আমাদের এখানে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল নামে একাট ঘোড়ার ডিম আছে। এটা কোনও কাজের না।’
মেজবাহ কামাল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে বলতে চাই, জাতীয় সংসদের অধিকার নিয়ে কথা বলুন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মূল জায়গা থেকে সরে এসেছেন। তারা রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু রায় নিয়ে রিভিউ করা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রধান বিচারপতি তার রায়ের পর্যবেক্ষণে দেশের রাজনীতিদের ‘ইমম্যাচিউর’ বলেছেন। কিন্তু আমি আামাদের দেশের রাজনীতিবিদদের ইমম্যাচিউর মনে করি না। এই রাজনীতিবিদরাই দেশ স্বাধীন করেছেন। তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন।’
মেজবাহ কামাল বলেন, ‘রায়ের পর্যবেক্ষণে তার (প্রধান বিচারপতি) ব্যক্তিগত অনেক মত আছে, যা তিনি বলতে পারেন না। আমাদের প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানের উহাহরণ টেনেছেন। কিন্তু এটা (বাংলাদেশ) তো পাকিস্তান না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক সুদৃঢ় অবস্থানে আছে।’ রায়ের পর প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে করা সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমার প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করব। কিন্তু তাকে অসম্মান করব না। কোনও কোনও মন্ত্রী যে ভাষায় তাকে নিয়ে কথা বলছেন, সেটা কাঙ্ক্ষিত নয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বৈঠকিতে বলেন, ‘সার্বিক যে ডিবেট হয়েছে, আমার মনে হয়েছে এটা হওয়া দরকার। কারণ আমরা তো গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি। ডিবেট মানেই ডেমোক্রেসি। তবে রায়ের মধ্যে একটা গন্ধ রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি বরাবর কোনও একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।’
সাংবাদিক স্বদেশ রায় (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ‘আমাদের সুপ্রিম কোর্ট তো রাজনীতিবিদরা তৈরি করেছেন। তাহলে এই ষোড়শ সংশোধনীর রায় কেন এলো? আমাদের বিচারকরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি, প্রধান বিচারপতি তার পদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে উনার (প্রধান বিচারপতি) কোনও ধারণাই নেই।’
স্বদেশ রায় আরও বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ওই দিনই তিনি নৈতিকভাবে প্রধান বিচারপতির পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।’
বাংলা ট্রিবিউনের প্ল্যানিং এডিটর নজরুল কবীর (ছবি- নাসিরুল ইসলাম)বাংলা ট্রিবিউনের প্ল্যানিং এডিটর নজরুল কবীর বলেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হয়েছে একটি কাগজের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের জন্ম হয়েছে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের সংবিধানের গুরুত্ব তাই অন্যরকম। সংবিধান অনুযায়ী, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। এই সংবিধানকে শ্রদ্ধা করতে হবে।’ প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক পদের প্রতি সবার সম্মান থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরও পড়ুন-
‘বিচারপতিরা কি সব জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে’

‘রাজনীতিবিদরাই সুপ্রিম কোর্ট তৈরি করেছেন’

‘বিচারপতিদের কেউ কেউ সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন’

‘রায়ের অবজারভেশন সুপ্রিম কোর্টের নয়, প্রধান বিচারপতির নিজের’