বাংলা একাডেমিতে ইঁদুরে কাটছে ৫৩ বছরের পত্রিকা

ইঁদুরে কেটে ফেলা পত্রিকার ছিন্নভিন্ন অংশ

দেশের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বাংলা একাডেমির পত্রিকা আর্কাইভ। ১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের সব জাতীয় ও সাপ্তাহিক পত্রিকা সংরক্ষণ করা হয় এখানে। এসব পত্রিকা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রমাণ বহন করে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ৫৩ বছরের এসব পত্রিকা এখন নষ্টের পথে। ধুলাবালিতে নষ্ট হচ্ছে, বাসা বেঁধেছে  মাকড়সা-তেলাপোকা, এমনকি ইঁদুরে কেটে ছিন্ন-বিছিন্ন করছে ইতিহাসের আকর এসব পত্রিকা। এছাড়া, গত ২০ বছর ধরে বাঁধাই করা হয়নি কোনও পত্রিকা। যেনতেনভাবে ভাঁজ করে অন্ধকার পরিত্যক্ত ভবনে রাখা হয় পত্রিকাগুলো।

বাংলা একাডেমির পুকুর পাড়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভবনের উত্তরপাশ ঘেঁষে সাদা জীর্ণশীর্ণ চার তলা ‘গোডাউন ভবনটি’র তিন তলার এক পাশে এই পত্রিকা আর্কাইভ। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে ২০০১ সালের একটি পত্রিকা চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা সরবরাহ করতে পারেননি। জানতে চাইলে তারা বলেন, ১৯৯৬ সালের পর থেকে পত্রিকা বাঁধাই বন্ধ রয়েছে। পত্রিকাগুলো সেলাই করে স্তূপ করে রাখা হয়। ফলে কেউ চাইলেও তা সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

পত্রিকার স্তূপ

আর্কাইভটি ঘুরে দেখা গেছে, গ্রন্থাগার শাখার নিয়ন্ত্রণে এই আর্কাইভটির আলমারিতে  রাখা হয়েছে ৫৩ বছরের পত্রিকা। আর্কাইভটির একটু ভেতরে চার-পাঁচটি কক্ষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময়ের সব পত্রিকা। কর্তব্যরতদের কক্ষগুলোয় আলো জ্বালাতে বললে তারা তাতে অপারগতা জানান। কারণ, সেখানে কোনও লাইটের ব্যবস্থাই নেই। যেগুলো ছিল তাও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনের আলোতে দেখা যায়, স্তূপ করা পত্রিকাগুলোতে ধুলা-ময়লা জমে আছে। মাকড়সা জাল বেঁধেছে পত্রিকাগুলোর ওপর। চারদিকে ঘুরছে তেলাপোকা। ইঁদুরে কাটা পত্রিকা এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যে কোনও সময় ধসে পড়ার আশঙ্কাও আছে। ঝুঁকিপূর্ণ ওই ভবনেরই দ্বিতীয় তলায় থাকা বিক্রয় ও বিপণন কেন্দ্রের অফিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নতুন নির্মিত এনামুল হক ভবনের তিন তলায়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভটি অবহেলায় পড়ে আছে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অবহেলায় আর্কাইভটি থাকার পেছনে ভবন সংকটকেই দায়ী করেছেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম। 

IMG_20171025_121137

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলা একাডেমি খুবই ছোট একটি জায়গা। আমরা আর্কাইভটি সরানোর মতো উপযুক্ত কোনও জায়গা পাচ্ছি না। সরকার নতুন এনামুল হক ভবন নির্মাণ করে দিলেও সেখানেও জায়গা হয়নি আর্কাইভের। কারণ, এখন যেখানে ভবনটি রয়েছে, সেখানে ছোট্ট একটি দালানে বিক্রয় কেন্দ্র, ক্যান্টিন ও ব্যাংক রয়েছে। ভবনটি নির্মাণের পর তাদের জায়গা দিতে হয়েছে। তবে নতুন করে আমরা একটি ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। ওই ভবনটি নির্মাণ করতে পারলেই আর কোনও সমস্যা থাকবে না ।’

বাংলা একাডেমির বিভিন্ন শাখায় কর্মরতরদের অভিযোগ, বাংলা একাডেমির বর্তমান প্রশাসনের অনীহার কারণেই আর্কাইভটির এই দশা। তারা বলছেন, বাংলা একাডেমি প্রেসের তিন তলা ভবনটির নিচ তলায় বই ছাপার কাজ হলেও দোতলা ও তিন তলা পুরো খালি পড়ে রয়েছে। সেখানেও আর্কাইভটি সরিয়ে নেওয়া যেতো।

IMG_20171025_121212

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাডেমির বিভিন্ন শাখায় লোকবল সংকট রয়েছে। তবে গ্রন্থাগার শাখায় এ সংকট সবচেয়ে বেশি। আবার লোকবল যা আছে তাদের বেশিরভাগকেই কাজ করানো হয় অন্য বিভাগে। শাখাটিতে একজন পরিচালক ও একজন উপ-পরিচালক রয়েছেন। গ্রন্থাগার সহকারী দু’জন থাকলেও তাদের কাজ করানো হয় মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান খানের দফতরে। ক্যাটালগার দু’জন থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র একজন, সিনিয়র বাইন্ডার পদে একজন থাকলেও তাকে দিয়ে কাজ করানো হয় প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে। এছাড়া, বাইন্ডারের দুটি পদ শূন্য রয়েছে। পাঠকক্ষ সহকারীর দুটি পদই শূন্য। কম্পিউটার অপারেটর পদে চার জন থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র একজন। একটি কম্পিউটার থাকলেও তা নষ্ট প্রায়। অন্যান্য দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আর্কাইভে নেই কোনও টেলিফোন লাইন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্কাইভে পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় পত্রিকার বাঁধাই ও সঠিকভাবে সংরক্ষণ হয় না। শুধু সেলাই করে স্তূপ করে রেখে দেওয়া হয়। পত্রিকা বাঁধাই হয় না বলে একটি কাটার মেশিনও বাংলা একাডেমি প্রেসকে দিয়ে রাখা হয়েছে ব্যবহার করতে।

IMG_20171025_121137

আর্কাইভটির দুরবস্থার কথা স্বীকার করে  বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলেই আর্কাইভটির অবস্থা খুবই খারাপ। আমারা চেষ্টা করছি দ্রুত এটার একটা ভালো পরিবেশ দেওয়ার। কিন্তু এজন্য অনেক অর্থ দরকার, যা আমরা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। আমরা একটি হিসাব করেছি, দুই কোটি টাকা হলে ওইসব পত্রিকা বাঁধাই, ভালো পরিবেশে নেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এটি বর্তমানে আমাদের মোস্ট প্রায়োরিটিতে রয়েছে।’

নতুন নির্মিত ভবনটিতে আর্কাইভ না সরানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এত বেশি পত্রিকা আমাদের সংরক্ষণে রয়েছে, নতুন ভবনের একটি ফ্লোরে এত জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা অন্য কোনও ভবনে জায়গা খুঁজছি, আশা করছি, আগামী জানুয়ারিতে আমরা কাজটি শুরু করতে পারবো।’

মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘আর্কাইভের ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এছাড়া, এত বইপুস্তক রয়েছে ভবনে। ফলে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। আমরা ওই ভবনের স্থানেই নতুন একটি ভবন তৈরির পরিকল্পনা করেছি। ভবনটি নির্মাণ হলেই সমস্যার সমাধান হবে।’