ঢাকার মোহাম্মদপুরে গজনবী রোডে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে আবাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য এই টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১। পাশে মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-২ নামে আরও একটি ভবন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গজনবী রোডে যে ভবন হয়েছে, সেখানে ৮৪টি ফ্ল্যাট হয়েছে। কিছু দোকান হয়েছে। এখানে একটি করে ফ্ল্যাট ও দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা। কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমিটিকে জানিয়েছে ৩৩জনকে সেখানে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাকিগুলোয় জোর করে উঠেছে।’একেক জন দু’টি করেও ফ্ল্যাট নিয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এবি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জোরপূর্বক মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছেদ করতে গেলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই আমরা তাদের কাউন্সেলিং করে উচ্ছেদ করতে বলেছি।’এ জন্য গণমাধ্যম ডেকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে জনমত তৈরিরও পরামর্শ কমিটি দিয়েছে বলে সভাপতি জানান।
বৈঠকের কার্যপত্রে দেখা গেছে, ৭২ জনের তালিকার মধ্যে ৩৯ জন বরাদ্দ ছাড়াই দখল করেছেন। ১১ জন দখলদার আদৌ ফ্ল্যাট বরাদ্দের যোগ্য কিনা, সে জন্য অধিক তদন্তের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০ জন বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হলেও তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এর আগেই ফ্ল্যাট দখল করে আছেন।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রমাণিত নন, কিন্তু ফ্ল্যাট দখলে রেখেছেন এমন আট জনের মধ্যে রয়েছে, বরিশালের উজিরপুরের শাহাজ মোল্লার ছেলে আব্দুল মোতালেব, দিনাজপুরের বিরল উপজেলার আব্দুল গফুরের ছেলে লুৎফর রহমান, নওগাঁর আত্রাইয়ের কদী সরদারের ছেলে মো. মোকছেদ আলী সরদার, শরিয়তপুরের নড়িয়ার উপজেলার মতিউর রহমানের ছেলে আতিকুর রহমান, মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী মাজেদা বেগম, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের কনা মিয়ার ছেলে ছানোয়ার উদ্দিন আহম্মেদ, বরগুনার পাথরঘাটার আব্দুল গনির স্ত্রী হাজেরা বেগম ও কুমিল্লার সদর উপজেলার রুস্তুম আলীর স্ত্রী হোসনে আরা বেগম।
এছাড়া, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের শমশের আলীর ছেলে তারা মিয়া, দক্ষিণ বাড্ডার আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুস সাত্তার (অন্ধ),মানিকগঞ্জের সদর উপজেলার ছেলে সিরাজ খানের ছেলে আনোয়ার হোসেন বাদল, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের খলিলুর রহমানের ছেলে মহিন উদ্দিন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, সে বিষয়ে অধিকতর সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মিরপুরের দুয়ারীপাড়ার সুরজত আলী মোল্লার ছেলে আমির হোসেন মোল্লা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, সে বিষয়ে অধিকতর সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে এবং তাকে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে যশোর জেলার সদর উপজেলার ছেলে মোকশেদ আলী মিয়ার ছেলে আব্দুল লতিফ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, সে বিষয়ে অধিকতর সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া তাকে রাজউক থেকে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে ৫ কাঠার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শুকুর আলী ও সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজারে ছেলে করম আলীর ছেলে মান্নান আলী পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের পক্ষ থেকে বাড়ি বরাদ্দের পরেও একটি করে ফ্ল্যাট দখল করে আছেন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ছেলে আব্দুর রহমানের ছেলে মো. কুদ্দুছ একটি ফ্ল্যাট দখলে রেখেছেন, যদিও যুদ্ধাহত প্রমাণের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যুদ্ধাহতদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাট ও দোকান দখল করে আছেন পাঁচ জন। তারা হলেন, সাভারের আমিন বাজারের ছেলে মো. আব্দুল লতিফের স্ত্রী বেগম বছিরন নেসা, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ছেলে গোলাম হোসেন তালুকদারের ছেলে আবু ছিদ্দিক ও টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ছেলে মোজাহার আলীর ছেলে মাইনুল হক, কুমিল্লার বুড়িচংয়ের মৃত আলী মিয়ার ছেলে মো. ফরিদ মিয়া, নরসিংদী সদরের ছেলে আব্দুল গফুরের ছেলে সিরাজুল ইসলাম। এই পাঁচ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বলে প্রতীয়মান হয়নি।
বরাদ্দ পাওয়া ফ্ল্যাটের বাইরে অন্য একটি ফ্ল্যাট দখল করে আছেন তিন জন। তারা হলেন, চুয়াডাঙ্গার মৃত জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ছেলে মো. হোসেনের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম, বগুড়ার শেরপুরের মো. আবুল হোসেনের ছেলে আবু শহীদ বিল্লাহ। এই তিন জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, সে বিষয়ে অধিকতর তদন্তের সিদ্ধান্ত আছে। বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে নরসিংদী সদরের আবু তাহেরের ছেলে আবদুর রহিমের, তবে তিনি একটি ফ্ল্যাট দখলে রেখেছেন।
বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাটের পরিবর্তে অন্য ফ্ল্যাট দখল করে আছেন ১৫জন। তাদের মধ্যে আছেন, ভোলার দৌলতখানের মো. শহীদুল্লাহ, জামালপুরের বকসীগঞ্জের লাল মিয়া, মৌলভীবাজারের বড়লেখার আনোয়ারা বেগম, যশোর সদরের মতিউর রহমান, যশোর সদরের মো. ফজলুল করিম, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের মৃত আব্দুল কাদেরের দুই ছেলে আমির মাহমুদ ও আশিক মাহমুদ, নড়াইলের কালিয়ার মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে মো. সেকান্দর আলী, মাগুড়া সদরের মৃত বেনোয়ারী বিশ্বাসের ছেলে চৈতন্য কুমার বিশ্বাস (যুদ্ধাহত কিনা তদন্ত চলছে), ঝিনাইদহের শৈলকূপার মৃত আবুল হোসেনের স্ত্রী সুরাইয়া পারভীন, যশোরের শার্শার মৃত সামসুর আলী মণ্ডলের স্ত্রী হামিদা মণ্ডল, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে হানিফ সরকার, সিরাজগঞ্জের কাজীপাড়ার মৃত আব্দুল আজিজ ভূইয়ার ছেলে মো. চাঁদ মিয়া (যুদ্ধাহত কিনা, তদন্ত চলছে, তার নামে রূপনগরে জমি বরাদ্দ আছে), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের মৃত আসগর আলীর ছেলে মো.সামসুর রহমান। আর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের মৃত হাফিজ অসীমের ছেলে সিরাজুল ইসলাম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছেন। কিন্তু বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাটের বদলে দু’টি ফ্ল্যাট দখল করে রেখেছেন। এছাড়া আজিমপুরে তার নামে বাড়ি বরাদ্দ আছে।
খুলনার দৌলতখানের কিরন চন্দ্র কির্ত্তনিয়ার ছেলে লিবিও কিত্তনীয়া বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাটের বদলে অন্য ফ্ল্যাট দখল করে রেখেছেন। মিরপুরেও তার প্লট রয়েছে।
ফ্ল্যাট দখলে রাখা চারজনের বিষয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, সে বিষয়ে অধিকতর তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা হলেন, যশোর সদরের নাজিম বিশ্বাসের ছেলে আব্দুল মাজেদ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নাজির মিয়ার ছেলে তরিক উল্যাহ, যশোরের অভয়নগরের মৃত শশধর দাসের ছেলে কালিপদ দাস, মাগুড়ার শালিখার মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে ফুল মিয়া। এ ছাড়া পাবনা সদরের মৃত ইসরাত আলীর ছেলে কেয়াম উদ্দীন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, তা সন্দেহজনক হওয়ায় তদন্ত চলছে।