আইন সংশোধনের আগে মালয়েশিয়ায় নতুন নিয়মে শ্রমিক নয়!

প্রবাসী শ্রমিকবিদ্যমান কর্মসংস্থান আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে মালয়েশিয়ার ফেডারেল সরকার। চাকরিদাতা এবং চাকরিপ্রার্থী উভয়ের স্বার্থরক্ষায় এই আইন সংশোধন করা হচ্ছে বলে সম্প্রতি মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সেদেশের মানবসম্পদ মন্ত্রী এম কুলাসেগেরান। তিনি বলেন, `কর্মসংস্থান আইন ১৯৫৫ পুনরায় রিভিউ করা হবে। এর জন্য স্টেকহোল্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা চলছে। এতে নতুন করে ৮টি ধারা সংযুক্ত হবে। আগামী সপ্তাহে খসড়াটি তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করছি। পুরোনো আইনে কিছু ধারা আছে যা বর্তমান শ্রম বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়, তাই যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে।’

এদিকে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফরেন ওয়ার্কার অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম (এসপিপিএ) পদ্ধতিতে আর কোনও শ্রমিক নিয়োগ করা হবে না বলে স্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্ট সিনারফ্লেক্সকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২১ আগস্ট পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সভাপতিত্বে গত ১৪ আগস্ট মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার ম্যানেজমেন্টের স্পেশাল কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগের বর্তমান ব্যবস্থা ফরেন ওয়ার্কার অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম (এসপিপিএ) সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বাতিল আদেশ কতদিন থাকবে তা পরে জানানো হবে। তবে এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আদেশ কার্যকর হওয়ার পর পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে অনুমোদনের পর নেওয়া হবে। মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফরেন ওয়ার্কার অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম (এসপিপিএ) পদ্ধতিতে শ্রমিক নিয়োগ সম্পূর্ণরুপে বাতিল করা হলো। এরপর এই বিষয়ে যে কোনও সিদ্ধান্ত দু’দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বৈঠকের পর আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তবে এই বৈঠক কবে হবে এবং কিভাবে হবে তার কোনও স্পষ্ট ধারণা কেউ দিতে পারেননি।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি (পলিসি অ্যান্ড কন্ট্রোল) দাতো ইন্দেরা খাইরুল জাইমি বিন দাউদ স্থানীয় রিক্রুটিং কোম্পানি সিনারফ্লেক্সকে জানিয়েছেন, পরবর্তীতে যেকোনও সিদ্ধান্ত ক্যাবিনেটের অনুমোদনের পর নেওয়া হবে। এর আগে মালয়শিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ শ্রমিক আমদানির ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুমোদিত এজেন্ট বিদেশে কর্মী পাঠায়, শিগগিরই তাদের সবাইকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের আবেদনপত্র প্রক্রিয়াকরণের অনুমোদন দেওয়া হবে। এর আগে মাত্র ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন ছিল। মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন, সবাইকে এই সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এজেন্সিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা সৃষ্টি হবে,যা কর্মীদের জন্য ইতিবাচক হবে। যার ফলে কমে আসতে পারে অভিবাসন ব্যয়। কারণ জিটুজি পদ্ধতিতে শ্রমিক নিয়োগে মালয়েশিয়ায় অভিবাসন খরচ ছিল মাত্র ৩০ হাজার টাকা। সেখানে বর্তমানে জিটুজি প্লাসের আওতায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ১০টি কোম্পানির মাধ্যমে খরচ ৪-৫ লাখ টাকা পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মালয়েশিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক বক্তব্যের পর স্পষ্ট যে, আইন সংশোধনের আগে এবং এরপর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমঝোতা ছাড়া নতুন পদ্ধতিতে শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ নেই। এদিকে মালয়েশিয়া থেকে একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন পদ্ধতিতে শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থায় যুক্ত হতে চায় মালয়শিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব সাপ্লাইয়ারস অ্যান্ড এমপ্লয়িজ ম্যানেজমেন্ট অব ফরেন ওয়ার্কার্স (টেকাম)। তারা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত এবং সব ধরনের সহায়তা করতে রাজি আছে।

সূত্রটি আরও জানায়, মালয়শিয়ার সরকার কর্মসংস্থান আইন সংশোধনের পর নতুন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় বসবে। এতে সময় ব্যয় হতে পারে অন্তত ছয় মাস। কিন্তু বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ইস্যু করা প্রায় ৪০ হাজার ভিসাধারী শ্রমিকের সেদেশে যেতে কোনও বাধা নেই। তারা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেদেশে আসতে পারবে। এরই মাঝে নতুন কর্মসংস্থান আইনের খসড়া তৈরি হয়ে অনুমোদনের জন্য কেবিনেটে চলে যাবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে দুই দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির সংগঠনের সঙ্গে পুনরায় একটি সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) করে নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, কর্মসংস্থান আইনের নতুন ধারার মধ্যে নিয়োগকর্তার ১৫ শতাংশ বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় বাকি শ্রমিক স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহের নির্দেশনা থাকার কথাও বলা হচ্ছে।

তবে সকল প্রক্রিয়া শেষে কিভাবে, কি পদ্ধতিতে শ্রমিক নিয়োগ হবে এ নিয়ে ধোঁয়াশায় আছে ফিলিপাইনের পাশপাশি খোদ বাংলাদেশ। তবে নেপাল সরকার মাহাথির মোহাম্মদের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পুনরায় শ্রমিক পাঠাতে একমত হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সদস্যরা মনে করছেন খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে এবং তারা এও নিশ্চিত করেছে যে মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার এখনও বাংলাদেশের জন্য খোলা এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তন হওয়ার পর নতুন করে খুব দ্রুতই আবার শ্রমিক নিয়োগের নতুন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বায়রা’র সাবেক যুগ্ম মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিঠিতে বলা হয়েছে যেই সিস্টেম চালু ছিল সেটা ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এর মানে হলো বর্তমান সিস্টেমের পরিবর্তে এখানে নতুন একটি সিস্টেম তৈরি করা হবে। এরপর বলা হয়েছে নতুন যেই সিস্টেম চালু হবে তা দুই দেশের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। দুই মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিবে এই সিস্টেমের পরিবর্তে কী উপায়ে কর্মী পাঠানো যায়। চিঠিতে তো কোথাও লেখা হয়নি যে মার্কেট স্থগিত। এর মানে আমরা বুঝতে পারি যাদের প্রসেস অলরেডি পাইপলাইনে চলে এসেছে তারা যেতে পারবেন। বিদ্যমান এই প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। ধাপগুলো অনুসরণ করে আমাদের কাছে আসে, তারপর ভিসার জন্য অ্যাম্বেসিতে জমা হয়। সেখান থেকে ভিসা আসতে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। এরপর ভিসা হলে ইমিগ্রেশনে জমা হয়। এই বিভিন্ন ধাপে কিন্তু ১০-১৫ হাজার কর্মীর কাগজপত্র জমা হয়। তাহলে এগুলোর কি হবে?’

নোমান আরও বলেন, ‘এই ব্যাপারে যদি বলে দিত প্রক্রিয়াধীন কাজও সাসপেন্ড করা হয়েছে তাহলে আমরা ধরে নিতাম বাজার বন্ধ। এই ধরনের কোনও চিঠি আমাদের মন্ত্রণালয় পায়নি, আমাদের অ্যাম্বেসি পায়নি। দু’দেশের সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না বলছে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ ততক্ষণ আমরা ধরে নিতে পারি আমাদের বাজার খোলা। আমরা আরও ২-৩ দিন অপেক্ষা করছি, আশা করি মালয়েশিয়ার সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য আসবে, কারণ সরকারি ছুটি চলছে সেদেশে।’

তিনি জানান, শ্রমবাজার বন্ধ করা সম্ভব না, কারণ এটি দু’দেশের পার্লামেন্টে অনুমোদন করা। সুতরাং এটিকে পরিবর্তন করতে হলেও দুই দেশের আলোচনা ছাড়া সম্ভব না। সিস্টেমটা কিন্তু তারা তাদের দেশে চালু করেছিল, আমাদের দেশে না। তারা তাদেরই সিস্টেমটাকে বলেছে যে ১ তারিখ থেকে তোমার কার্যক্রম সাসপেন্ড করা হলো। তার মানে হলো আমরা আর কোনও এপ্রুভাল সেখানে জমা দিবো না।

তবে এমওইউ প্রসঙ্গে নোমান বলেন, ‘বায়রা এই মুহূর্তে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন কার্যকরী কমিটি নেই। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যেটা আছে সেটা শুধু মাত্র নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য। আগামী মাসে নির্বাচন আমাদের। বায়রাও এই মুহূর্তে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময় ছাড়া আমার মনে হয় না বায়রা’র কোনও কমিটি হবে। যেহেতু নির্বাচিত কোনও কমিটি নেই , তাই কোনও কিছু কার্যকর করা সম্ভব না। তাই এই মুহূর্তে বায়রা’র কোনও কিছুতেই অংশগ্রহণ নেই।

জনশক্তি,কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক ড. নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যাদের ভিসা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তারা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যেতে পারবে। এতে কোনও বাধা নেই।

বিএমইটি’র মহাপরিচালক মো. সেলিম রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি। শ্রমবাজার বন্ধের যে খবর ছড়িয়েছে, তাও ঠিক নয়। তবে কর্মী নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। কী পরিবর্তন হবে, কীভাবে হবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া অফিসিয়ালি আমাদের জানায়নি। তবে যারা আগে ভিসা পেয়েছেন, তাদের মালয়েশিয়া যেতে কোনও বাধা নেই।’