নির্বাচনকালীন সরকারের বাধ্যবাধকতা নেই






জাতীয় সংসদ (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি দল থেকে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণনার শুরুতেই অক্টোবরে গঠিত হবে এই সরকার। এর আকারও ছোট হবে। তবে গত সংসদের ধারাবাহিকতায় যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এত তোড়জোড় শুরু হয়েছে, সংবিধানে সেই নির্বাচনকালীন সরকারের কোনও বিধান নেই। প্রয়োজন বা বাধ্যবাধকতা নেই আলাদা করে এই সরকার গঠনের। এর আকার পরিবর্তনেরও বাধ্যবাধকতা নেই। বিদ্যমান সরকারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ধারাবাহিকভাবে তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবে। ওই সরকারে অধীনেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) তার সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করবে।
সংবিধান ও আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এবং সংবিধান পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও নির্বাচনকালীন কোনও সরকার গঠনের বাধ্যবাধকতা না থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের সরকার ওই সময় যেহেতু কোনও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবে না, তাই ওই সময় সরকারের আকার ছোট করবে। যাকে তারা ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ বলছেন।

নির্বাচনকালীন সরকার গঠন বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগামী অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। সে সময় মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকেই এটা হবে। বিষয়টি পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।’
বর্তমান সরকারই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব নেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই সরকারের আকার ছোট হবে। ওই সময় মেজর কোনও পলিসি বা ডিসিশন নিতে পারবে না। সেই সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও মন্ত্রিপরিষদের আকার ছোট করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেছিলেন জানিয়ে গত ৩০ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী তোফালে আহমেদ বলেন, ‘যে সরকার নির্বাচনকালে থাকবে সেটা নির্বাচনকালীন সরকার। এই সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। মেজর কোনও পলিসি টানবো না, মেজর কোনও পলিসি পরিবর্তন করবো না। আর নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, যেকোনও মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে।’
এর আগে সরকারের চার বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’
সরকার গঠনের বিষয়ে সংবিধানের বিধান উল্লেখ করে আইনজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান সরকারই সংসদ নির্বাচনের সময় ধারাবাহিকভাবে তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। নির্বাচনের জন্য সরকারের ধরন বা আকার পরিবর্তনের কোনও প্রয়োজন পড়বে না। তবে প্রধানমন্ত্রী তার এখতিয়ারের অংশ হিসেবে চাইলে সরকারের আকার পরিবর্তন করতে পারেন। এটা তার সাংবিধানিক ক্ষমতা, যা তিনি নির্বাচনের আগেও করতে পারেন, চাইলে এখনও করতে পারেন।
সংবিধান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকার বলে কোনও বিধানের অস্তিত্ব নেই। নেই সর্বদলীয় সরকারের বিষয়টিও। জাতীয় নির্বাচনের সময় সরকারের ধরন বা আকার ভিন্ন হবে— এমন কথাও নেই।
সরকারের বিধান বিষয়ে সংবিধানের ৫৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনোকিছুই অযোগ্য করিবে না।’
আর ৫৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকিলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে; তবে এই পরিচ্ছেদের বিধানাবলী-সাপেক্ষে তাহাদের উত্তরাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাহারা স্ব স্ব পদে বহাল থাকিবেন।’

সংবিধান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকারের নির্বাহী বিভাগ ইসিকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। সংবিধানের এই দুই বিধানের আলোকে ইসিকে সরকারের সহযোগিতা করা ও নির্বাচনকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসির পরামর্শ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে আরপিও ও নির্বাচনি বিধিমালার আলোকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নসহ কিছু কিছু কাজে সরকারকে কমিশনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে— এমন উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন, নির্বাচনের সময় সরকারি প্রটোকল গ্রহণ, ডাকবাংলোসহ সরকারি স্থাপনার ব্যবহার বা এ জাতীয় কিছু কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ থাকে।


জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার সংবিধানে নেই। এটার কোনও বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োজনও নেই। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে কথা বলা হচ্ছে তা সংবিধানের সঠিক ব্যাখ্যা নয়। এখন যে সরকার রয়েছে সেই সময় সেই সরকার থাকবে। নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকারই দায়িত্ব পালন করে যাবে।’
সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের হাতে। কমিশন নির্বাচন করবে। সরকার তো নির্বাচন করবে না। সরকারের কাজ হচ্ছে নির্বাচনের সময় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়তা করা। সংবিধান অনুসারে এটা করতে সরকারের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।’
আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট স ম রেজাউল করিম বলেন, ‘সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার নামে কিছুই নেই। কাজেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করার আইনগত বা সাংবিধানিক কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে তার মন্ত্রিসভাকে ছোট আকারে পুনর্গঠন করতে পারেন। অবশ্য এটা করতেই হবে, তা নয়। মন্ত্রিসভার পরিসর সম্প্রচার বা সংকোচন করা নিরঙ্কুশভাবেই তার (প্রধানমন্ত্রী) এখতিয়ার।’
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোনও বিধান সংবিধানে নেই। ক্ষমতাসীন সরকারই নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করবে। এক্ষেত্রে সরকার চাইলে তার কোনও কোনও কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে বিরত যে থাকতেই হবে— এমন কোনও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই।’
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন সেহেতু ওই সময় তার সরকার নীতিনির্ধারণী কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের অর্থ বেশি নষ্ট করতে চান না বলেই ওই সময় সরকারের আকার ছোট করবেন। এটাকেই আমরা নির্বাচনকালীন সরকার বলছি।’

কেমন ছিল দশম নির্বাচনের সময়ের সরকার
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল, ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর নতুন সংসদ নির্বাচনের দিনগণনা শুরুর পর সংসদ অধিবেশন আর বসবে না। ওই সময় ‘নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার’ দায়িত্ব নেবে বলেও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়। তবে নির্বাচন ইস্যুতে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় দুটি ঘটনাই পিছিয়ে যায়। ওই সময় অধিবেশনের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়। আর তার দুদিন আগে ১৮ নভেম্বর সরকারে নতুন কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। একইসঙ্গে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন পদত্যাগ করেন। সেটাকে ওই সময় নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার আখ্যায়িত করা হয়। ওই সরকার দায়িত্ব দেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ২৫ নভেম্বর দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।
ওই সময় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নতুন মন্ত্রীদের শপথ নেওয়ার আগে ওই সরকারের সব মন্ত্রীই তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে নতুন করে ছয়জন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। ওই সময় সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারে ২২ জন মন্ত্রী ও সাতজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নতুন শপথ নেওয়া আটজনের বাইরে যারা ছিলেন তারা আগের মন্ত্রিসভা থেকে ধারাবাহিকভাবেই বহাল ছিলেন। তবে তাদের কারো কারো দফতর পুনর্বন্টন হয়েছিল। এদিকে শপথের আগে সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ১৬ মন্ত্রী ও ১৪ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। ওই সরকার নির্বাচনকালে তাদের দায়িত্ব অব্যাহত রাখে। তবে তারা নীতিনির্ধারণী কোনও ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সহায়তা করে।