পাকিস্তান ভয় পেয়েছিল
১৯৭২ সালে সোভিয়েত সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লেনিনগ্রাদে এক ভোজ সভায় বলেন, ‘সোভিয়েতের ভয়ে ওরা আমাকে ফাঁসি দেয়নি।’ ৫ মার্চের দৈনিক বাংলায় এ খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেওয়া এই আনুষ্ঠানিক সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সোভিয়েত সরকার ও জনগণের প্রতিবাদে পাকিস্তান সরকার ভয় পেয়ে যায়। আর সেজন্যই তারা আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো থেকে বিরত থাকে। এ ব্যাপারে আপনাদের কাছে আমি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের স্বদেশে ফেরত আনার ব্যাপারে সোভিয়েত সরকার প্রভাব খাটাবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদ্রে গ্রোমিকো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের সঙ্গে আলোচনাকালে এ আশ্বাস দেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন উপমহাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়ন করেন, তখন পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ফেরত আনার প্রস্তুতি নিয়েও তারা কথা বলেন।
সর্বশেষ সংশোধিত কর্মসূচিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সফর শেষে ৬ মার্চ ঢাকা ফিরবেন। সোভিয়েত মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকবেন। এর আগে লেনিনগ্রাদের মেয়র আলেকসাদ্র সিজভের দেওয়া ভোজসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কতগুলো সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর বাংলাদেশ সরকারের বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত। শত্রুর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মুক্তি লাভকারী দুটি দেশের জনগণের বন্ধুত্ব, দুটি দেশের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র ও শোষণের অবসান। এমন বন্ধুত্বের আর কোনও নিদর্শন দরকার পড়ে না।’
তিনি বলেন, ‘দুই দেশের জনগণের সরকার শান্তি প্রত্যাশী। এখানে তারা অভিন্ন এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও বাড়বে।’ তিনি পুনরায় সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের সংগ্রামকে সমর্থনের জন্য তিনি ভারতের সরকার ও জনগণ এবং তাদের নেতা ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এর আগে লেনিনগ্রাদের মেয়র বঙ্গবন্ধুর সুস্বাস্থ্য কামনা করেন এবং বীরত্বপূর্ণ মুক্তি সংগ্রামের জন্য বাংলাদেশের জনগণ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আরও সংহত হবে।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের এইদিনে বঙ্গবন্ধুর ডাক
একাত্তরের মার্চের সেই বিক্ষুব্ধ বাংলায় ৪ মার্চ জনগণের সংগ্রাম এগিয়ে চলছিল। সারাদেশে সেদিন বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় সর্বাত্মক হরতাল, বিক্ষুব্ধ জনতার দৃপ্ত মিছিল আর স্লোগানের মধ্য দিয়ে বাংলার মুক্তি আন্দোলন ধাপে ধাপে এগোতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যেকোনও মূল্যে মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’
উপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ এমনকি কিশোররাও যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে তিনি সবাইকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘যেকোনও মূল্যে মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে যেতেই হবে।’
ভাসানীর ডাক
মাওলানা ভাসানী ডাক দিলেন, ‘সাত কোটি বাঙালির দাবি মেনে না নিলে শুধু শহরে-বন্দরে নয়, ৬২ হাজার গ্রামে যেকোনও ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলবে ।’ এদিকে হানাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এদিন চট্টগ্রামে তারা বেপরোয়াভাবে হত্যা করে ১২০ জনকে, আর খুলনায় সাত জনকে। কিন্তু জনতা দমেনি। তারা আরও এগিয়েছে। ছাত্রলীগ ঢাকায় কর্মসূচি দিয়েছে, শিক্ষকরাও মিছিলের প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রচণ্ড আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামে গ্রামে।
সংগ্রামে এগিয়ে এসেছে সব শ্রেণির মানুষ
কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা ছাড়াও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংগ্রামে এগিয়ে এসেছে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সমাজ। বেতার টিভি শিল্পীরা এদিন থেকে বর্জন করেছেন বেতার-টিভি অনুষ্ঠান। সার্বিক মুক্তি আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে সাংবাদিক ইউনিয়ন। মিছিল ও গণসমাবেশসহ আরও কর্মসূচির আয়োজন করেন তারা। ৭ মার্চের স্বাধীনতার ডাকের পূর্ব প্রস্তুতি চলছিল মার্চের ১ তারিখ থেকেই।