রাজধানীর বাজারগুলোয় এখন জাটকায় (ইলিশের বাচ্চা) সয়লাব হয়ে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে যাতে ধরা না পড়েন সেজন্য মাছ বিক্রেতারা ক্রেতাদের কাছে এগুলোকে জাটকা হিসেবে স্বীকার না করে বলেন ‘চাপিলা’। প্রতি কেজি জাটকা বিক্রি হয় দুশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকায়। আর একেক কেজিতে জাটকা ওঠে ৪৫ থেকে ৫৫টি! অথচ দেশে এখন জাটকা সংরক্ষণের সময় চলছে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা বা আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। জেলেদের জাটকা আহরণে বিরত রাখতে সারা দেশে তালিকাভুক্ত মোট ৩ লাখ ১ হাজার ২৮৮টি জেলে পরিবারকে প্রতিমাসে ৪০ কেজি হারে চাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগামী দুই মাস এ সহায়তা পাবেন তারা। এ তালিকার বাইরে থাকা জেলেরাও পাচ্ছেন এই সহায়তা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বাজারে এত জাটকা আসছে কোত্থেকে? এই জাটকা কারা ধরছে ?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইসের সংক্রমণের কারণে সব মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতসহ অসহায় দুর্গতদের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। এই ফাঁকে কোস্টগার্ড, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক শ্রেণির অতি লোভী জেলে ঘরে থাকার নির্দেশ অমান্য করে নদীতে জাল ফেলছে। আর সেই জালে ধরা পড়ছে শত শত টন জাটকা। যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে যাচ্ছে এবং অবাধে বিক্রিও হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর মাতুয়াইলের মুসলিম নগর এলাকার মাছ বিক্রেতা নাজির হোসেন জানিয়েছেন, যাত্রাবাড়ি মাছের পাইকারি আড়ত থেকে প্রতিদিন সকালে জাটকা কিনে আনি। সেখানে খোলামেলাভাবেই পুলিশের সামনেই তো এগুলো বিক্রি হচ্ছে। কই ? কেউ কোনোদিন কিছু বলেছে বলে তো শুনিনি। আমাদের বলে লাভ কী? মাছগুলো বাজারে না এলে তো আমরা কিনতাম না। নদীতে ধরা বন্ধ করতে পারলে বাজারে জাটকা বিক্রি এমনিতেই বন্ধ হবে। তিনি জানান, নদীতে জাটকা ধরা বন্ধ করতে না পারলে বাজারে হামলা দিয়েও ইলিশ রক্ষা করা যাবে না।
বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার প্রাদুর্ভাব চলাকালেই ৬৭৬ কোটি ১৯ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যের কারেন্ট জাল জব্দ করেছে বাংলাদেশ নৌ পুলিশ। একইসঙ্গে শত শত টন জাটকাও জব্দ করা হচ্ছে। তারপরও শত শত টন জাটকা প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
পটুয়াখালীর জেলে মকবুল হোসেন জানিয়েছেন, রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে বাঁধা নেট দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা জাটকাসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত, যা বাংলাদেশের জন্য হুমকি। শুধু চরমোন্তাজই নয়, দেশের সর্বত্রই চলছে একই অবস্থা।
তিনি জানান, অনেকেই মনে করেন বেশিরভাগ ইলিশ মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি। বাংলাদেশের নদীতে এসে মা ইলিশ প্রতিবছর যে পরিমাণ ডিম ছাড়ে সেগুলোর রেণু ও ছোট জাটকা রক্ষা করা যায় তাহলে ইলিশের উৎপাদন আগামীতে ব্যাপকভাবে বাড়বে। কারণ, বাঁধা জালের ১ কেজি জাটকা মাছের বাজার মূল্য সর্বোচ্চ ২০০ টাকা, যা এক বছরে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকার ইলিশে পরিণত হতে পারে।
মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ ইঞ্চির ছোটো সাইজের ইলিশ যাকে জাটকা নামেই চেনে সাধারণ মানুষ তা ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসময়ে জাটকা ধরা, বিক্রি, মজুত ও পরিবহন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রশাসনের কঠোর অভিযান না থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জাটকা নিধন ও বিক্রি হচ্ছে। জাটকা ধরা নিষেধাজ্ঞা জারির শুরুর প্রথম দুদিনে অভিযান চললেও পরে তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে জেলেরা দলবলে নদীতে নামে জাল নিয়ে। তাদের দাবি, মাঠ পর্যায়ে মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। নদীগুলোয় প্রশাসনের নজরদারিও নাই। এই সুযোগেই জাটকা ধরার প্রবণতা বেড়েছে। এভাবে জাটকা নিধন হলে ভরা মৌসুমে কাঙ্খিত ইলিশ পাওয়া কঠিন হবে।
একদিকে সরকারি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে, অপরদিকে জাটকাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। সরকারের লোকসান উভয় দিক থেকে। এমনটাই জানালেন জেলা পর্যায়ের একজন মৎস্য কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। একইসঙ্গে ব্যস্ত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। তাই নদীতে এই সময় জাটকা সংরক্ষণে অভিযান পরিচলনা করা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই ব্যস্ত করোনা সংক্রামন ঠেকানোর কাজে। আর কোস্টগার্ডের একার পক্ষে এতবড় এলাকা দেখে রাখা সম্ভব নয়।
এদিকে মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জাটকা ধরা থেকে বিরত রাখতে দেশের ২০ জেলার ৯৬টি উপজেলায় ২৪ হাজার ১০৩ টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এ সময় দেশের মোট ৩ লাখ ১ হাজার ২৮৮টি জেলে পরিবার প্রতিমাসে ৪০ কেজি হারে আগামী দুই মাস (এপ্রিল ও মে) এ সহায়তা পাবেন। সেই সহায়তা বাবদই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আগে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ দুই মাস একই উপজেলাগুলোয় ২ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৩টি জেলে পরিবারকে ২২ হাজার ৪৭৭ টন ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে। চাল বিতরণের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে খাদ্য সহায়তা না পাওয়া জেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা নতুন মঞ্জুরি আদেশে বলা হয়েছে।
বরাদ্দপ্রাপ্ত ২০ জেলার ৯৬ উপজেলাগুলো হলো, ঢাকার দোহার, মানিকগঞ্জের শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর; রাজবাড়ীর সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ, শরীয়তপুরের জাজিরা, ভেদরগঞ্জ, নড়িয়া ও গোঁসাইরহাট, মাদারীপুরের সদর, কালকিনি ও শিবচর, ফরিদপুরের সদর, মধুখালী, সদরপুর ও চরভদ্রাসন, মুন্সিগঞ্জের সদর, শ্রীনগর, লৌহজং, টংগিবাড়ী ও গজারিয়া, ভোলার সদর, বোরহানউদ্দিন, চরফ্যাশন, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, লালমোহন ও মনপুরা, পটুয়াখালীর সদর, কলাপাড়া, বাউফল, গলাচিপা, দুমকি, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ ও রাঙাবালি, বরিশালের সদর, মুলাদী, হিজলা, বানারীপাড়া, উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ ও গৌরনদী, পিরোজপুরের সদর, মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, ইন্দুরকানী, নেছারাবাদ, কাউখালী ও নাজিরপুর; বরগুনার সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, বামনা, বেতাগী ও তালতলি, ঝালকাঠির সদর, রাজাপুর, নলছিটি ও কাঁঠালিয়া, চাঁদপুরের সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ, লক্ষ্মীপুরের সদর, কমলনগর, রামগতি ও রায়পুর; ফেনীর সোনাগাজী, নোয়াখালীর সদর, হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ, চট্টগ্রামের সদর, বাঁশখালী, সীতাকুণ্ডু, সন্দীপ, আনোয়ারা ও মিরসরাই, বাগেরহাটের সদর, মোরেলগঞ্জ, ফকিরহাট, মোংলা, কচুয়া, শরণখোলা ও রামপাল এবং সিরাজগঞ্জের সদর, কাজীপুর, চৌহালি, বেলকুচি ও শাহজাদপুর।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, করোনার মতো ভয়ঙ্কর অবস্থাতেও আমরা মৎস্যজীবীদের জন্য কাজ করছি। আগামীতে আরও বড় ধরনের পরিকল্পনা আমরা নেবো। ইতোপূর্বে যেসব জেলে মানবিক এই সহায়তা পাননি, এ বরাদ্দ বিতরণের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। মন্ত্রী বলেন, আমরা তালিকা বা তালিকার বাইরে, জেলে এবং জেলে সংশ্লিষ্টদের ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিচ্ছি।