ঘরে ঘরে শেখ মুজিব আছে, বলে দিলে রক্ষা থাকবে না: বঙ্গবন্ধু

11

সচিবালয়ের সরকারি কর্মচারীদের সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আজ শেখ মুজিব আছে, একবার বলে দিলে আর রক্ষা থাকবে না।’

১৯৭২ সালের ৪ মে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট কর্মচারী সমিতি আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন বঙ্গবন্ধু।

পুরনো মনোবৃত্তি ত্যাগ করে সরকারি অফিসার ও কর্মচারীদের জনগণের সেবকের মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করতে বলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পুরনো মনোবৃত্তি ছেড়ে জনগণের খাদেমরূপে কাজ করুন।’ সরকারি কর্মচারীদের প্রতি বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিদেশে যোগসাজশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বানচালের চেষ্টা করা হলে সেই ষড়যন্ত্র সমূলে উৎপাটিত হবে।’

হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এ বিষয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ডাক দিলে আপনারা আবারও হাতিয়ার নিয়ে এগিয়ে আসবেন। প্রয়োজন হলে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমাদের সম্মিলিত শক্তির আবারও প্রমাণ দেবো।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যারা আয়ুব সরকারের আমলে টাকা খেয়ে বিদেশ গেছে, সারা জীবন শুধু সমালোচনা করে কাটিয়েছে, তারা জানে শুধু গণ্ডগোল পাকাতে। গঠনমূলক কাজ কোনোদিন তারা করেননি।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের দেখি নাই। সংগ্রামকালে সীমান্ত এলাকায় তারা কোনোদিন আসেনি। আর আজ তারা হুমকি দিচ্ছে ‘

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে সমালোচনা করার অধিকার কেউ দেয় না। কিন্তু তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন বলে এদের কিছু বলছেন না।’ তিনি বলেন, ‘এটা কোনও দুর্বলতা নয়। নিছক গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা। কাজেই গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সুযোগের অপব্যবহার করে ষড়যন্ত্রকারীরা যদি অধিক খেলায় মেতে ওঠে, তাহলে তিনি জনগণকে আবারও ডাক দেবেন বলে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন।’ কর্মচারী সমিতির সভাপতি সিরাজুল হক ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বঙ্গবন্ধু অস্ত্রবহনকারী দুষ্কৃতকারীদের পাকড়াও করার আহ্বান জানান।

33তিনি প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও বেতন বৃদ্ধির জন্য কমিশন নিয়োগের কথা উল্লেখ করে কর্মচারীদের সততার সঙ্গে কাজ করতে বলেন। চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধেও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, ‘অস্ত্র গোপন করে কিছু লোক চুরি, ডাকাতি ও রাহাজানি চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে তারা রাজাকার আলবদর সদস্য।’

বঙ্গবন্ধু তথ্য প্রকাশ

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য একটি সংগঠনের সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করেন। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ৫ মে’র সংবাদে বলা হয়—কর্মচারী সমিতির সভায় বঙ্গবন্ধু জানান, এ ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমানোর জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কখন হ্রাস পাবে, তিনি তা জানেন না। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের চেষ্টা চলছে।’

সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে পার্থক্য দূরীকরণ

প্রধানমন্ত্রী একই সভায় জানান, বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিরাট পার্থক্য দূর করার উদ্দেশ্যে একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কমিটি ফর্মুলাভিত্তিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পদের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দূর করতে ও কাঠামো প্রস্তুত করতে কমিশন নিয়োগ করা হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে কমিশন রিপোর্ট পেশ করবে।’

22ছাত্রীদের ডেকে নিলেন বঙ্গবন্ধু 

বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট ভবনের সামনে এক আবেগময় দৃশ্যের অবতারণা হয়। তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রীরা সুরক্ষিত সেক্রেটারিয়েট ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে বাধার সম্মুখীন হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের বাধা দেননি। হাসিমুখে তিনি তাদের ডেকে পাঠান। দৈনিক বাংলায় পরের দিনের (৫ মে) খবরে প্রকাশ—পলিটেকনিকের ছাত্রীরা তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে মিছিল নিয়ে সেক্রেটারিয়েটে আসেন। কিন্তু তাদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। পরে জানতে পেরে বাইরে প্রচণ্ড রোদে অপেক্ষমাণ ছাত্রীদের ভবনে প্রবেশ করতে বঙ্গবন্ধু অনুমতি দেন। তাদের দাবি বিবেচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়ে তিনি মন্ত্রী, কর্মকর্তা এবং অন্যদের গাড়িতে ছাত্রীদের স্ব-স্ব গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।