করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে শুরু হয়েছে কঠোর লকডাউন। বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই লকডাউন ৭ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। কঠোর লকডাউন কার্যকর করতে পুলিশ, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাব সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।
বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা শহরগুলোতে জরুরি পণ্যবাহী যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কেবল অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে যানবাহন চলাচল করছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল সীমিত রয়েছে।
ময়মনসিংহ: জেলায় কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মহানগরীসহ জেলার ১৩ উপজেলায় ৫ প্লাটুন সেনাবাহিনী ও ৩ প্লাটুন বিজিবি মাঠে নেমেছে। লকডাউন সফল করতে বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকাল ৬টা থেকেই সেনাবাহিনী ও বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও আর্মড পুলিশের টহল জোরদার করা হয়।
সেনাবাহিনী ও বিজিবি মাঠে নামার বিষয়টি নিশ্চিত করে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. এনামুল হক জানান, লকডাউন সফল করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলার ১৩ উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ প্লাটুন সেনাবাহিনী ও ৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্য কাজ করছেন। এছাড়া পুলিশ, আনসার ও আর্মড পুলিশও মাঠে আছে।
এদিকে সকাল থেকেই সড়কে গণপরিবহণ বন্ধ আছে। পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে কিছু কিছু রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও চলাচল করতে দেখা গেছে। মহানগরীতে দোকানপাট ও কাঁচাবাজার বন্ধ দেখা গেছে। মানুষের চলাচল ছিল খুবই সীমিত।
খুলনা: সরকার ঘোষিত সাতদিনের কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে খুলনায় সতর্ক রয়েছে প্রশাসন। মহানগরী ও জেলার সর্বত্র পুলিশ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সড়কের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। সকালে রাস্তা-ঘাট ফাঁকা দেখা গেছে। তবে গল্লামারী বাজারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা বাজারে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে লোকসমাগম হতে শুরু হয়। এদিকে মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা। সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছান তারা। এরপর তারা টিম হয়ে শহর ও তৃণমূলে ছড়িয়ে টহল জোরদার করেন।
খুলনার জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে খুলনায় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এক ব্যাটালিয়ান সেনা সদস্য আমার কার্যালয়ে এসে পৌঁছান। এরপর আলোচনা করে ১০টি টিম নগরী এবং ৯ উপজেলায় টহলের জন্য যায়। প্রতিটি সেনা টিমের সঙ্গে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
এদিকে গল্লামারী বাজারে আসা আবু হোসেন বলেন, মোহাম্মদনগর থেকে বাজার করতে এসেছি। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকের পরিবেশ ভিন্ন। এ বাজার ভোর থেকেই জানকীর্ণ হয়ে থাকে। কিম্তু আজ বাজারে দোকানপাট বেশি খোলেনি। মানুষজনও অনেক কম। এবার আসলেই লকডাউন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ভ্যানে সবজি বিক্রেতা সোবহান শেখ বলেন, গত রাতে পাইকারি বাজার থেকে কেনাকাটা করে সব গুছিয়ে রাখি। আর সকাল ৭টার দিকে এ বাজারে আসি। অন্য দিনগুলোতে ভোর ৫টায় এ বাজারে চলে আসি। তখন ভ্যান নিয়ে ব্রিজ পার হতে পারি না। মানুষের ভিড় থাকে অনেক। আজ সকাল ৭টায় এখানে এসে দেড় ঘণ্টা পর ক্রেতা দেখা গেছে। এরপরই বাজারে লোকসমাগম বাড়তে শুরু করে। বেচা বিক্রিও হয়।
রাজশাহী: রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নাটোর কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে সোনাবাহিনী এসে রাজশাহীতে লকডাউনে দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। এছাড়া সকাল থেকে রাজশাহীতে বিজিবিও দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দফতর থেকে ছয়জন অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন রয়েছেন। আগের বিশেষ লকডাউনে নগরীতে চারজন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে ছিলেন। তারাও মাঠে রয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। রাস্তায় মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সিলেট: কঠোর লকডাউনে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সড়কে তৎপর রয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকাল থেকে সিলেট নগরীর মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের তৎপরতা দেখা গেলেও সেনাবাহিনীর তৎপরতা চোখে পড়েনি। তবে সিলেটের সকাল থেকেই ফাঁকা ছিল। জরুরি কাজ ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। সড়কে নেই কোনও গণপরিবহন। চলাচল করছে কিছু রিকশা ও মোটরসাইকেল। পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে হেঁটে অনেককে অফিসে যেতে দেখা গেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ বলেন, বিনা কারণে কেউ ঘর থেকে বের হলে এবং বিধিনিষেধ অমান্য করলে কঠোর আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। এবার রিকশা ব্যবহার করা গেলেও কোনও ইঞ্জিনচালিত যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না। তা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া মাঠে ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। সরকার জরুরি সেবা বলতে যা বুঝিয়েছে এর বাইরে কোনও যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জরুরি সেবার প্রয়োজন হলে সেগুলো নিতে পারবেন বলে জানান তিনি। সিলেট মহানগরীর ছয় থানা ও পুলিশ ফাঁড়িকে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম: বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া লকডাউনে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট মানুষের আনাগোনা কমেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সড়কে গার্মেন্ট কর্মী আর জরুরি সেবা সংস্থার কাজের সঙ্গে জড়িত ছাড়া অন্যদের খুব একটা দেখা যায়নি।
কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে সকাল ৬টা থেকে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। সরকার ঘোষিত বিধি-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করতে নগরীর সাতটি প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। এছাড়া সকাল ১০টা থেকে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসনের ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের ১২টি টিম।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১২ পৃথক টিম সার্কিট হাউস থেকে একযোগে সকাল সাড়ে ১০টায় অভিযান শুরু করেছেন।
তিনি জানান, বাকলিয়া-চকবাজার এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুমা জান্নাত, খুলশী এলাকায় ইনামুল হাসান, কোতোয়ালি এলাকায় মো. উমর ফারুক, বায়েজিদ এলাকায় জিল্লুর রহমান, পাঁচলাইশ-চান্দগাঁও এলাকায় রেজওয়ানা আফরিন, হালিশহর এলাকায় মাসুদ রানা, বন্দর-ডবলমুরিং এলাকায় নূরজাহান আকতার সাথী, আকবরশাহ-পাহাড়তলী এলাকায় ফাহমিদা আফরোজ ও বায়েজিদ এলাকায় প্লাবন কুমার বিশ্বাস দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে লকডাউনে যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যাত্রীবাহী বাস রিজার্ভ করে স্টাফদের কারখানায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তবে যে সব প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থা করেনি তাদের স্টাফরাই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এদিকে হাসপাতালসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক-নার্সদের জন্য যান বাহনের ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। নগরীর স্টেশনরোড এলাকার বাসিন্দা ডা. শারমিন জানান রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার ডিউটি রয়েছে। ডিউটি স্টেশন থেকে বার বার ফোন দেওয়া হলেও রিকশা না থাকায় তার যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অন্যদিকে রিকশার সংখ্যা কম থাকায় জরুরি কাজে বের হয়ে হেঁটেই অনেকে গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
এদিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রায়হানুল ইসলাম জানান, লকডাউনের সামান্যতম বিঘ্ন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। যদিও ওষুধ ও খাবারের দোকান ছাড়া বন্ধ ছিল সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পায়ে হেঁটে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে চলাচল করেছে। এদের অনেকের মুখে ছিল না মাস্ক, আবার কারো কারও মুখে মাস্ক থাকলেও তা ছিলো থুঁতনির নিচে। তবে সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন কড়াকড়ির কথা বলেছে। পুলিশ ও জেলা প্রশাসন লকডাউন বাস্তবায়নে চেষ্টা করার কথা জানিয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, নগরীর বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ তৎপর রয়েছে। জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন হায়দার বলেন, সরকারি নির্দেশনা বাস্তাবায়ন এবং বরিশালে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ চলছে।
নারায়ণগঞ্জ: সরকারের কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ নারায়ণগঞ্জ শহরে ব্যাপক তৎপর রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সড়ক-মহাসড়কে কোনও গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলতে দেওয়া হচ্ছে না। বিষেশ কারণে বা জরুরী প্রয়োজনে কেউ রাস্তায় বের হলেই পড়তে হচ্ছে পুলিশের জেরার মুখে। রাস্তার বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে ছেড়ে দেওয়া হয়, অন্যথায় আটকে দেওয়া হচ্ছে তাদের।
জেলা ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসনের ২০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্ব নগরীর বিভিন্ন স্পটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। লকডাউন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে জেলা পুলিশ ৩০টি চেকপোস্ট বসিয়ে মানুষ ও যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, লকডাউন বাস্তবায়ন করতে সকাল থেকে জেলা পুলিশের সদস্যরা কাজ করছেন। নারায়নগঞ্জ শহরসহ জেলায় প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রতিটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। যাতে কোনোভাবেই বিনা কারণে কেউ রাস্তায় বের হয়ে ঘুরাঘুরি করতে না পারে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে হাইওয়ে পুলিশ ছয়টি চেকপোস্ট বসিয়েছে। যাতে কোনও ইঞ্জিনচালিত যানবাহন প্রবেশ বা বের হতে না পারে।
গাজীপুর: লকডাউনে গাজীপুর সদর এলাকা অনেকটাই ফাঁকা দেখা গেছে। সকাল থেকেই পুলিশ সদস্যরা লাঠিসোটা নিয়ে বিভিন্ন দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। অনুমোদিত যানবাহন ছাড়া কোনও গণপরিবহন সড়কে দেখা যায়নি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখা গেছে উপজেলা শহরের দিকে চলাচল করেছে। ইঞ্জিনচালিত ওইসব রিকশাগুলোকেও পুলিশ ধাওয়া করেছে। শহরে নিত্যপণ্য ও কাঁচাবাজর ছাড়া অন্যসব দোকানিপাট বন্ধ ছিল।
এদিকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকে পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছেছে। আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মীদের আনা-নেওয়া করতে পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে।
মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুল বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর একটা অংশ মুন্সীগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছে। সকাল থেকে সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে। এদিকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার নৌপথে মানুষ ও যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। মানিকগঞ্জের আরিচা ও রাজবাড়ির দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ফাঁকা রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোর থেকে দুটি ঘাটেই ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ থাকলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঘাটগুলো ফাঁকা রয়েছে।
যশোর: বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যশোরে চলছে কঠোর বিধিনিষেধ। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রয়েছে। জেলার অভ্যন্তরীণ সব রুটে এবং আন্তজেলা বাস, ট্রেন ও গণপরিবহনসহ সিএনজি, রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ আছে। যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. সায়েমুজ্জামান বলেন, সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার ও র্যাব সদস্যরা সড়কেদায়িত্ব পালন করছেন।
নোয়াখালী: জেলায় মানুষকে ঘরে রাখতে ও লকডাউন কার্যকরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে পুলিশি চেকপোস্ট। প্রধান সড়কে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।
লকডাউন মনিটরিংয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পাঁচটি মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে। মোবাইল টিমগুলো জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।
এছাড়া সেনাবাহিনীর চারটি পেট্রল টিম টহল দিবে। আজকে একটি সদর এলাকায় অপরটি বেগমগঞ্জ এলাকায় টহল দিবে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাবের দুটি টিম সকাল ৮ থেকে রাত ৮ পর্যন্ত টহল দিবে। একটি সদর এলাকায় অপরটি কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় টহল দিবে।
অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চল গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি: লকডাউনের সকাল থেকেই খাগড়াছড়িতে বৃষ্টি হচ্ছে। জেলার অনেক নিন্মাঞ্চলে উঠেছে পানি। বৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে অনেকটা গৃহবন্দি জনজীবন। সরেজমিন ঘুরে এবং বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বশীল লোকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনে খাগড়াছড়ি জেলার নয় উপজেলার সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল দিচ্ছে পুলিশ- সেনাবাহিনী ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বন্ধ রয়েছে দোকানপাট, যানবাহন, অফিস ও আদালত। সীমিত আকারে খাবার হোটেল শর্ত সাপেক্ষে খোলা থাকার কথা থাকলেও চোখে পড়েনি সেই দৃশ্য।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএইচএম মাগফুরুল হাসান আব্বাসি বলেন, সকাল থেকে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে শহরে পাঁচটি মোবাইলটিম কাজ করছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে লাকডাউন বাস্তবায়নে মাঠে আছেন। তিনি আরও জানান, শহরের প্রবেশ পথগুলোতে সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর অবস্থান রয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নেয় করোনা
প্রতিরোধে গঠিত সমন্বয় টিম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এমরানুল ইসলাম বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সরকার ঘোষিত বিধিমালা কঠোরভাবে পালন করা হবে। জরুরি কাজ ছাড়া সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে রাস্তায় না আসার আহবান জানান তিনি।
পঞ্চগড়: প্রথম দিনে লকডাউন বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে যৌথবাহিনী। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যদের নিয়ে যৌথবাহিনীর টহল দল শহরের বিভিন্ন সড়কে টহল দিচ্ছে। মোড়ে মোড়ে অবস্থান করছে পুলিশ। পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলীসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিবৃন্দ বাজার মনিটরিং করেছেন। জেলা শহরের সব দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ ছিল। ফাঁকা সড়ক মহাসড়কে যাত্রীবাহী ও গণপরিহন চোখে পড়েনি। তবে কৃষিপণ্য, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কিছু পরিবহণ ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেছে। রিকশা-ভ্যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীর সংখ্যা ছিল কম। শহরের কাঁচাবাজার ও মাছ মাংসের দোকানে লোকজনের ভিড় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কম ছিল।
সাতক্ষীরা: লকডাউনের প্রথমদিনে সাতক্ষীরায় বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একযোগে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। জেলার সাতটি উপজেলায় নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, জেলায় সেনাবাহিনীর ১০টি পেট্রল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে সাত উপজেলায় সাতটি টিম কাজ করছে। রিজার্ভ রাখা হয়েছে তিনটি টিম। এছাড়া জেলায় তিন প্লাটুন বিজিবি ও পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্যরা কাজ করছেন। জেলায় ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে।
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ যৌথভাবে মাঠে কাজ করছে।
এর আগে, বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কঠোর লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাস্তায় থাকবে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবও। অপ্রয়োজনে কেউ রাস্তায় বের হলে জেল-জরিমানা করা হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রয়েছে। রেল ও নৌপথে গণপরিবহনসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে। অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, শপিংমল, মার্কেটসহ সব দোকানপাট, সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে লকডাউন বাস্তবায়নে ১০৬ কর্মকর্তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করবেন ৫৫ কর্মকর্তা। খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে ১২, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে ছয়, রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে দুই, সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে দুই, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে ৯, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে পাঁচ এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে ১৫ জন কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন।