প্রতিবার ঈদুল ফিতরের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ঢাকা ছাড়েন। অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক ঘরমুখো মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে গিয়ে পথে পথে ভোগান্তির শিকার হন। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটে নাকাল হতে দেখা গেছে। এবার ঈদযাত্রায় তেমনটা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অন্যান্যবারের তুলনায় এ বছর ঈদযাত্রায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনও ভোগান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ জন্য মহাসড়ক প্রশস্ত করা, সড়কের অবস্থা ভালো থাকা, ঈদের ছুটি বৃদ্ধি, গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, স্কুল আগে ছুটি হওয়া এবং মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরাকে সুফল হিসেবে দেখছেন তারা।
শবে কদরের দিন সরকারি ছুটি থাকায় ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে বুধবার (১৯ এপ্রিল) থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের নির্বাহী আদেশে বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল) ছুটি ঘোষণা। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের ছুটি পাঁচ দিন বা ছয় দিন হবে এ বছর। ছুটির প্রথম দিন মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) থেকে ঘরমুখো মানুষের ভিড় তৈরি হয় বাস-রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে। দ্বিতীয় দিন বুধবার (১৯ এপ্রিল) ও তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল) এই জনস্রোত আরও বাড়তে দেখা গেছে, যা শুক্রবারও (২১ এপ্রিল) অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের দেওয়া তথ্যমতে, মঙ্গলবার ঢাকার বাইরে গেছে ১২ লাখের বেশি সচল মোবাইল সিম, ঢাকায় ঢুকেছে সাড়ে ৬ লাখের বেশি সিম। বুধবার এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬ লাখ ও ৬ লাখ। সব মিলিয়ে ঈদের ছুটির প্রথম দুই দিনে ঢাকার বাইরে গেছে ২৯ লাখ ৯২৩টি সিম, ঢাকায় এসেছে ১৩ লাখ ৩০৫টি সিম। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়েছে।
এরইমধ্যে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাড়িতে গেলেও অন্যান্যবারের মতো কোথাও দীর্ঘ যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও সড়কে উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকায় যানবাহনের চাপের কারণে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। এ ছাড়া দুই-একটি স্থানে চৌরাস্তায় সাময়িক যানজট সৃষ্টি হয়েছে আর পদ্মা সেতু ও বঙ্গবন্ধু সেতুতে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, এবার ঈদে লম্বা ছুটির কারণে লাখ লাখ মানুষ বাড়িতে গেছেন। এর মধ্যে প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া ব্যক্তিরা যেমন রয়েছেন, তেমনই সচরাচর যারা বাড়িতে না যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এসব মানুষ এবার স্বস্তিতে বাস, ট্রেন ও লঞ্চযোগে গন্তব্যে যেতে পেরেছেন। শুক্রবারও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই স্বস্তির ঈদযাত্রার পেছনে কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন, ঢাকার সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর যে মহাসড়ক রয়েছে, তার অধিকাংশ প্রশস্ত করা হয়েছে। অনেকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেনে বিভক্ত করা হয়েছে। কিছু জায়গায় উন্নয়ন কাজ চলমান থাকলেও সড়কের অবস্থা মোটামুটি ভালোই রয়েছে। ফলে আগের চেয়ে ঈদযাত্রায় যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও কোথাও তেমন জট তৈরি হয়নি। পদ্মা সেতু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলায় গাড়ি বেড়েছে কয়েকগুণ, ফেরির ভোগান্তি নেই।
তারা আরও উল্লেখ করেছেন, বৃহস্পতিবার নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণা করায় ঈদের ছুটি বেড়েছে। স্কুল আগেভাগে (১৩ এপ্রিল) বন্ধ দেওয়ায় সন্তানদের নিয়ে অনেক পরিবার ঈদের ছুটির আগেই বাড়িতে চলে গেছে। বাদবাকি বিপুল সংখ্যক চাকরিজীবী বাড়িতে ছুটলেও উপচেপড়া ভিড় এড়ানো গেছে। এই সময়ে কয়েক লাখ মানুষ মোটরসাইকেলে চেপে বাড়ি ফেরাও স্বস্তি বয়ে এনেছে।
রোড সেফটির নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবার ঈদযাত্রায় স্বস্তি আসার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্য পদ্মা সেতু, টাঙ্গাইলে ফোরে লেন মহাসড়ক, রাস্তার অবস্থা ভালো, বৃষ্টি না হওয়া, স্কুল আগে ছুটি দেওয়া, মোটরসাইকেলে যাওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। তবে ঈদের পরে ঢাকায় ফেরার ক্ষেত্রে ছুটি কম থাকায় ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবার ঈদের ছুটি লম্বা হওয়া এবং লাখ লাখ মানুষ মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ওপর চাপ কমেছে। এ ছাড়া পুলিশের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। প্রধানত এসব কারণে ঈদযাত্রায় স্বস্তি এসেছে বলে আমরা মনে করছি। এর সঙ্গে আরও কিছু ছোটখাটো বিষয় তো রয়েছেই।
তবে সরকারি সংস্থাগুলো ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার জন্য ঢাকার ২০টি পয়েন্টসহ দেশের যানজটপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ ৪৬টি পয়েন্টে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার কথাও উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবার এই উদ্যোগ নিয়েছে। তা ছাড়া এই ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে প্রথমবারের মতো সারা দেশের প্রশাসন ও অংশীজনদের নিয়ে অনলাইনে মিটিং করা হয়েছে। এতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরাও অংশ নেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এবার আগে থেকেই ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যানজটপ্রবণ স্থানগুলোতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ অনেকগুলো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে ঘরমুখো মানুষেরা।
বুধবার (১৯ এপ্রিল) গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে এ তথ্য জানিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘যেগুলো বেশি বেশি যানজটপূর্ণ পয়েন্ট, সেখানে দুই শিফটে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ আছে। আমাদের মনিটরিং টিমও কাজ করছে। আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ঈদের আগে ও পরে সাত দিন রাস্তায় থাকবেন, যাতে কোনও ধরনের সমস্যা না হয়।’
বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল) গাজীপুরে চান্দনা চৌরাস্তায় সড়কের পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঈদে সারাদেশে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সড়ক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, আনসার ব্যাটালিয়ান দল, প্রশাসন, ম্যাজিস্ট্রেট, গোয়েন্দা কর্মীরা। পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, ডগ স্কোয়াডসহ অন্যরাও একসঙ্গে কাজ করছে। সবার নিজ নিজ গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছাতে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এদিকে, এবার ঘরমুখো ঈদযাত্রীদের ভিড় থাকলেও বাস ও রেলস্টেশন এবং লঞ্চঘাটে পৌঁছাতে অন্যান্যবারের মতো ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, নগর গণপরিবহনে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ রয়েছে। সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, সদরঘাট, মহাখালী ও গাবতলীমুখী পরিবহনে ভিড় সবচেয়ে বেশি। এসব স্টেশন থেকে কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউবা লঞ্চে চেপে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবেন। কোথাও রাস্তা ফাঁকা থাকলেও সিগন্যালগুলোয় যানজট লেগে যাচ্ছে।