আড়তে নেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশ, জেলেপল্লিতে হতাশা

দুই-তিন বছর ধরেই উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ মিলছে না। জেলেরা বলছেন, বন্দরগুলোর আড়তে নেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশের সমারোহ। এ কারণে পুরো জেলেপল্লিতেই হতাশা। মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, বর্জ্য থেকে পানিদূষণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও ইলিশের অভয়াশ্রমের প্রবেশপথ ভরাট হয়ে যাওয়াই ভরা মৌসুমে ইলিশের দেখা না মেলার মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন সমুদ্রে দীর্ঘ ডুবোচর থাকায় রামনাবাদ, আগুনমুখা, আন্ধারমানিক ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় ইলিশের আনাগোনা কমে গেছে। বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ইলিশ সবসময় ঝাঁকে চলে। চলার পথে বাধা পেলে সেখান থেকেই ফিরে যায় ইলিশ। ফলে সাগর থেকে নদীতে প্রবেশমুখে ডুবোচরে বা কোনও বাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ইলিশের ঝাঁক বাধাপ্রাপ্ত হলে আর ভেতরে প্রবেশ করে না। ফলে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ।  

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর অক্টোবর মাসে গভীর সাগর থেকে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীর মিঠা পানিতে ছুটে আসে। তারপর ইলিশের পোনা উপকূলীয় নদ-নদী ও পদ্মা-মেঘনায় বিচরণ করে। এ সময় তাদের আকার বাড়তে থাকে। শুধু মার্চ ও এপ্রিল– এ দুই মাস জাটকাকে সুরক্ষা দিতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। সাধারণত বৈশাখ মাস থেকেই শুরু হয় ইলিশের মৌসুম। এ সময় জেলেদের জালে ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।

কঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ আসছে না উপকূলীয় এলাকার আড়তগুলোতে (ছবি: কুয়াকাটা প্রতিনিধি)

ইলিশের প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে গত ১৯ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। জেলেরা বলছেন, ২৩ জুলাই মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর সাগরে নেমেও প্রত্যাশা অনুসারে ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। অগভীর সমুদ্রে পেতে রাখা জালে মাঝারি ও ছোট আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে, তবে তা ‍আশানুরূপ নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়েনি। গভীর সমুদ্রে বড় ফিশিং ট্রলার থেকেও খবর আসছে, প্রত্যাশা অনুসারে ইলিশের দেখা মিলছে না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে বঙ্গোপসাগরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারে প্রতি বছর ৬৫ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চালু করা হয়।  ২০১৯ সালে সব ধরনের নৌযানকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়। এ সময় ইলিশ শিকার ও পরিবহন সম্পূর্ণ অবৈধ। যদিও শুরু থেকেই এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছেন জেলেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পর্যাপ্ত ইলিশের অভাবে অনেকটাই অলস সময় পার করছেন চাঁদপুর, ভোলা, পাড়েরহাট, পাথরঘাটা বন্দরের ইলিশের আড়তদাররা। শ্রাবণের ভরা মৌসুমে সব নদী পানিতে টইটুম্বুর। তারপরও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়াটা অনেকটাই হতাশার। ইলিশকেন্দ্রিক বাণিজ্য মূলত এই সময়টাতেই জমে। তা না হলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী, আড়তদার ও জেলেরা না খেয়ে মরবেন।

আশানুরূপ ইলিশ না পেয়ে জেলেরা হতাশ (ছবি: কুয়াকাটা প্রতিনিধি)

এ প্রসঙ্গে পিরোজপুরের পাড়েরহাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন মাতুব্বর জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞার ৬৫ দিন শেষ হয়েছে। জেলেরা জাল নিয়ে সাগরে গেছেন। আমরা আশা করেছিলাম নিশ্চয়ই ভালো মাছ তারা পাবেন। আমাদের এই ব্যবসাটা জমে উঠবে। কিন্তু জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। ফলে ব্যবসাটাও জমছে না।

একই কথা বলেন ভোলার ইলিশ ব্যবসায়ী আশরাফ আলী। তিনি জানিয়েছেন, ইলিশ গভীর সমুদ্রের মাছ বলেই জলবায়ু পরিবর্তন, প্রচণ্ড গরম, অনাবৃষ্টির কারণে নদীতে কম পানিতে আসছে না। আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে, গরম কমলে, নদীতে পানি বাড়লে, ডুবোচর কমানো গেলে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে, এমন আশা জেলেদের।

বরগুনার পাথরঘাটায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য গবেষক জয়নাল আবেদিন জানিয়েছেন, সরকার ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপে ফলাফল আসছে না। অসাধু জেলেরা নির্বিচারে ইলিশের পোনা নিধন করছে। এ কারণে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা তো আছেই। মা ইলিশ রক্ষা এবং জাটকা যদি বাঁচানো যায়, তাহলে এই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলেও মনে করেন তিনি।

এদিকে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ৬০০ গ্রামের ইলিশ ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এক কেজি সাইজের ইলিশ ১৬০০ টাকা, এক কেজি ২০০ গ্রামের ১৮০০ টাকা ও দেড় কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা কেজি দরে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজ্জাদ মাহমুদ জানিয়েছেন, গবেষকদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। বৃষ্টি না হওয়ায় সমুদ্রে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ। বৃষ্টির সঙ্গে ইলিশের একটি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে ইলিশ মাছ গভীর সমুদ্র থেকে ওপরে উঠে আসে।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইলিশ সম্পদ রক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি এ বছর ছয় লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হবে।