২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা আগুনে আটকে থাকে কর্মরত শ্রমিকেরা। মারা যায় ১১৪ জন। বেঁচে যাওয়াদের অভিযোগ, আগুন লাগার পরে ফ্লোরের গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়ায় বের হতে পারেনি শ্রমিকেরা। সারা বিশ্ব সেদিন দেখেছে পুড়ে ছাই হওয়া দেহ। কিন্তু বিচার চাইতে গিয়ে এখন আর সাক্ষীর দেখা মেলে না। ২০২৩ সালে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডের আগুনের ঘটনায় করা মামলায় মাত্র চারটি শুনানির দিন ধার্য হয়েছে এবং প্রতিটা তারিখেই সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রসিকিউশন।
কেন সাক্ষী পাওয়া যায় না প্রশ্নে প্রসিকিশন বলছে, চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সাক্ষী আনতে সমন দেওয়া হয়, শ্রমিকেরা আগের ঠিকানায় না থাকায় তাদের আনা যায় না। যদিও শ্রমিকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ আছে এমন নেতারা বলছেন, সাক্ষী আনতে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে মামলা দীর্ঘস্থায়ী ও দুর্বল করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—তবে কী ন্যায়বিচার পাবে না ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা? পুরো বিশ্ব যে আগুন ও হত্যাকাণ্ড দেখেছে সেটার সাক্ষী না পাওয়ার যৌক্তিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার দশক পেরিয়ে গেলেও কেবল সাক্ষ্য গ্রহণেই থমকে আছে বিচারকাজ। মামলার ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১১ জন।
আলোচিত এ মামলাটি বর্তমানে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ১ নভেম্বর মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ দিন ধার্য ছিল। ওই দিনও সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।
এ বছরে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৬টি তারিখ (১ জানুয়ারি, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ৩০ মে, ১৯ জুলাই, ৩ সেপ্টেম্বর ও ১ নভেম্বর) ধার্য ছিল। একটি তারিখেও রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। গত ১ নভেম্বর আগামী শুনানির জন্য ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ নির্ধারণ করে দিয়েছেন আদালত।
সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না বলা হলেও সেদিনের আগুনের ভিকটিমরা প্রতি বছর এই দিনে একসাথে হন। ৮ তলা ভবনের ৫ তলায় কাজ করতেন আঞ্জুয়ারা। অগ্নিকাণ্ডের সময় ৫ তলা থেকে কোনোভাবে প্রাণে বাঁচলেও এখনও ক্ষত নিয়ে ঘুরছেন। তিনি বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফলতিতে এত শ্রমিকের প্রাণ গেলো এবং আমরা আহত হয়ে এখনও বেঁচে আছি। বিচারটা পেলাম না।
তাজরীন ট্র্যাজিডির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কারখানা মালিক দেলোয়ারসহ কয়েকজন কারখানা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় ২টি আলাদা মামলা দায়ের করেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুলিশ কারখানা মালিক দেলোয়ারসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলা দুটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১-এ চলমান রয়েছে।
অগ্নিদুর্ঘটনার পরের বছর সিআইডি অভিযোগপত্র দেয়। আসামিরা হলেন—তাজরীনের এমডি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলামসহ ১৩ জন। বর্তমানে আসামিরা সবাই জামিনে আছেন। মামলার সাক্ষী ১০৪ জন। তাজরীনের ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির এমডিসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়।
সেই মামলায় ১১ বছরে এসেও বিচার শেষ না হওয়ারে প্রহসন বলে উল্লেখ করেন গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ। নিয়মিত আদালতে খোঁজ রাখা ও তাজরীনের শ্রমিকদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, এই ঘটনার যদি সাক্ষীর অভাবে বিচার সম্পন্ন না হয় তবে এরচেয়ে হতাশার আর কিছু নেই। তিনি দাবি করেন, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সাক্ষী এনে দেওয়ার কথাও একপর্যায়ে প্রসিকিউশনকে বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি।
উল্লেখ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা আছে, “তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে সংঘটিত এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। যা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগুন লাগার বিষয়টি নাশকতা হতে পারে, তবে এত বিপুল মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য মালিকের অমার্জনীয় অবহেলাই দায়ী।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. মুর্শিদ উদ্দীন খাঁন বলেন, আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। সাক্ষী আনতে সমন দেই, সাক্ষীরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এখন তাদের কোথা থেকে খুঁজে বের করবো?