লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। নতুন সরকারের এক মাসের মাথায় এ ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সর্বত্রই ছিল এক ভিন্নরকম আবহ। বিশেষ করে অনেক দিন পর জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতির নামাজ আদায়, একই সময়ে নিজ নিজ কার্যালয়ে সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই নেতার আমন্ত্রণেই কূটনীতিকদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে রাজনীতিতে নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেকে। অতীতে সরকার ও বিরোধী দলীয় প্রধান পরস্পর ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও এবার শুধু সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলীয় নেতাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়নি বলে জানা গেছে। তবে রাষ্ট্র গঠনে সবার সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এসব বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর দেড় বছরের মাথায় একটি নির্বাচিত নতুন সরকারের আমলে প্রথম ঈদ উদযাপন হলো। যেখানে একটি নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল সক্রিয়। তাই এর একটি নতুন মাত্রা অবশ্যই আছে। যেহেতু এ সরকার রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সেহেতু আমার মনে হয়— রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের এক ধরনের বোঝাপড়া আছে। এক্ষেত্রে সরকার হয়তো চেয়ার হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে। মূলত সাংবিধানিক কারণেই এমনটি হচ্ছে। আর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় হয়তো বিশেষ প্রেক্ষাপটের কারণে রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঈদগাহে জাননি। আর সরকারবিরোধী দলীয় প্রধান একে-অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে রেওয়াজ অনুযায়ী। এবার যদি কোনোদিক থেকে এমনটি না হয়ে থাকে, সেটা হয়তো মিসটেক। এটা এমন কোনও বিষয় নয়।’’
ঈদের আগেই বিষাদে রূপ নেয় আনন্দ
ঈদ আনন্দ উদযাপনের সব প্রস্তুতির আগে এবার বিষাদের রেখা টেনে দেয় রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা। এতে দুইজনের নিহতের ঘটনা ছিল বেদনাদায়ক।
একই জামাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতিতে নতুন মাত্রা?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তখন তাকে নিয়ে কেউ কেউ তীর্যক সমালোচনা করেন। তখনকার সরকার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাকে রাখেনি। এমনকি জাতীয় ঈদগাহে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস থাকলেও থাকেননি রাষ্ট্রপতি। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের অভিভাবক হলেও তার না থাকা নিয়ে নানা কথা ছিল। তবে নির্বাচিত সরকার হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সব আচার-অনুষ্ঠানেই থাকছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের ঈদুল ফিতরে জাতীয় ঈদগাহে পাশাপাশি ঈদের নামাজ আদায় করেছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। পরে তারা কোলাকুলি করেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা মূল্যায়ন করেছেন নেটিজেনরা।
নিজেদের কার্যালয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় সরকার ও বিরোধী দলীয় নেতার
ঈদের নামাজের পরপরই যমুনায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে কূটনীতিক, রাজনীতিবিদসহ বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে এক ধরনের মিলনমেলা ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সবাইকে বিশেষ আপ্যায়ন করা হয়। অবশ্য কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত আমন্ত্রিত অনেক অতিথি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাননি।
একই সময় মিন্টো রোডে নিজের বাসভবনে প্রথমবারের মতো শুভেচ্ছা বিনিময় করেন জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। প্রথম দফায় কূটনীতিক ও দ্বিতীয় দফায় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।
সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়ে যা জানা গেল
রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও অতীতে সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতা একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাতেন। তবে এবার ঘটেছে ভিন্ন রকম ঘটনা। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা প্রধানমন্ত্রীকে ঈদের শুভেচ্ছা উপহার পাঠিয়েছেন। এমনকি তাদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের কোনও প্রতিনিধি যাননি। আর সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আমন্ত্রণপত্র বিরোধী দলীয় নেতাকে দেওয়া হয়েছে কিনা বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান।
এ বিষয়ে বিএনপির দফতর বিভাগের এক নেতা জানান, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছেন। তবে তাদের পক্ষ থেকে অনুরূপ কোনও কার্ড পাঠানো হয়নি।
প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর
প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘‘জনগণ যে দেশ দেখতে চায়, সেভাবে দেশ চালাতে কাজ করবে সরকার।’’
ঈদের দিন দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘‘এই ঈদে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। জনগণ যে দেশ দেখতে চায়, সেই দেশ গড়তে কাজ করবে সরকার।’’
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এবারের ঈদ কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ একটা নতুন সরকারের প্রথম ঈদ এটি। তাই এর একটি রাজনৈতিক আবহ অবশ্যই আছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঈদের নামাজ আদায়, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তবে ধীরের ফ্যাসিবাদী শক্তিকে স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া হয়, কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে। তবে ঈদ সামগ্রিকভাবে স্বস্তির হয়েছে।’’