বাজেট ২০২৬-২৭ ঘোষণা কাল

কী বার্তা আসছে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে 

দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং কর্মসংস্থানের চাপের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক সেই সময় জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক রূপরেখা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট হতে যাচ্ছে। তবে বাজেটের আকার যত বড়, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও তত বড়। কারণ সরকারের সামনে একদিকে রয়েছে রাজস্ব আহরণের বড় ঘাটতি, অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটের মূল প্রশ্ন একটাই—অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকার কি করের বোঝা বাড়াবে, নাকি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে স্বস্তি দেওয়ার পথ বেছে নেবে?

বড় বাজেট, বড় ঘাটতি

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশের সমান।

এই বিপুল ঘাটতি পূরণে সরকারের পরিকল্পনা হলো— ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেট ঘাটতির বড় অংশ ঋণের মাধ্যমে পূরণ করার অর্থ হলো ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। আগামী অর্থবছরে শুধু দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা কৃষির মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দের চেয়েও বেশি।

রাজস্ব আদায়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য

সরকার আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে— এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

ফলে বিশাল এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে করজাল সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। এ কারণেই ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, ১৫০ সিসির বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনে টিআইএন সংযুক্ত করা এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের মতো পদক্ষেপ আসতে পারে।

সাধারণ করদাতাদের জন্য কিছু স্বস্তি

রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ করদাতাদের জন্য কিছু স্বস্তির ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী— ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হতে পারে। নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই আন্দোলনে আহতদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়তে পারে। বছরজুড়ে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ চালু হতে পারে। আগাম রিটার্ন জমা দিলে করছাড় এবং দেরি করলে জরিমানার বিধান আসতে পারে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা

দেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার অভিযোগ করে আসছেন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার কয়েকটি বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। এর মধ্যে রয়েছে— রফতানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা , বিদেশি ঋণের সুদের বিপরীতে উৎসে কর কমানো, নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত টার্নওভার সীমা ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করা, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতি বহাল রাখা, ব্যবসায়িক লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু করছাড় দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না, জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসা সহজীকরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তায় রেকর্ড বরাদ্দ

এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।

এর আওতায় প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে— ফ্যামিলি কার্ড: ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবে। কৃষক কার্ড: ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষক বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবেন। জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের ভাতা: ১৬ হাজারের বেশি ব্যক্তি ও পরিবার এ সুবিধার আওতায় আসবেন। কর্মহীন শ্রমিক সহায়তা: চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য তিন মাস পর্যন্ত ভাতার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগী ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে।

কৃষি পাচ্ছে না প্রত্যাশিত গুরুত্ব?

খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি হওয়া সত্ত্বেও কৃষি খাতের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। যদিও টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বেড়েছে, তবে মোট বাজেটের অনুপাতে কৃষির হিস্যা কমে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩.১ শতাংশে।

অন্যদিকে কৃষি ভর্তুকি প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতে আরও বড় সহায়তা প্রয়োজন ছিল।

সবুজ অর্থনীতিতে জোর

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে উৎসাহ দিতে বাজেটে বড় ধরনের কর সুবিধা আসছে। প্রস্তাব অনুযায়ী— সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি পাবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা বিদ্যুৎ বিলে ছাড় পেতে পারেন। বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪-৮০ শতাংশে নামানো হতে পারে। ব্যাটারি ও চার্জিং অবকাঠামোর কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হতে পারে।

কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে

শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর ফলে দাম কমতে পারে— এসি, ফ্রিজ, দেশীয় মোবাইল ফোন, পিওএস মেশিন ও লিপস্টিক, লোশন ও প্রসাধনী সামগ্রী এবং কিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে দাম বাড়তে পারে— সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য, আমদানি করা কাজুবাদাম, রড, পাঙাশ ফিলেট।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বর্তমানে দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ মূল্যস্ফীতি। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র করছাড় বা ভর্তুকি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার তদারকি এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাতে নেমে এসেছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৭৫ শতাংশে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য নির্ভর করবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের ওপর।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বাস্তবায়ন

সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের মতো খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণে বাজেটটি উচ্চাভিলাষী ও জনকল্যাণমুখী বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটি একটি ঋণনির্ভর, উচ্চ ঘাটতিসম্পন্ন এবং রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বাজেটও।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর— রাজস্ব আহরণ, ব্যয়ের দক্ষতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ কাগজে-কলমে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করা যতটা সহজ, বাস্তবে সেই অর্থ সংগ্রহ, ব্যয় এবং কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শুধু একটি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হবে বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, নীতিগত সক্ষমতা এবং উন্নয়ন কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষা।