২০ বছরে ঋণ বেড়েছে ১৬ গুণ

দুই দশকে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬ গুণ। একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছেছে রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। কমেছে প্রবৃদ্ধি, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি, দুর্বল হয়েছে ব্যাংক খাতের মূলধনভিত্তি এবং বেড়েছে বৈষম্য। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে গিয়ে এমনই এক উদ্বেগজনক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন তিনি। বাজেট বক্তৃতার এক পর্যায়ে বিগত সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বিএনপি সরকারের সময়ের বিভিন্ন সূচকের তুলনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ভুল নীতির কারণে অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে পড়েছে।’’

ঋণের পাহাড়, বেড়েছে সুদের বোঝা

অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ২০ বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬ গুণ।

একই সময়ে বৈদেশিক ঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেশি।

ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই দশকে সুদ ব্যয় বেড়েছে ১৩ গুণেরও বেশি।

খেলাপি ঋণে রেকর্ড, দুর্বল ব্যাংক খাত

ব্যাংকিং খাতের অবনতির চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

শুধু খেলাপি ঋণই নয়, ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অবস্থাও অবনতির দিকে গেছে। ২০০৫ সালে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

কমেছে প্রবৃদ্ধি, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।’’

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।

অর্থমন্ত্রীর মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলেছে।

বেড়েছে বৈষম্য, কমেছে বিনিয়োগ

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্নীতি এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি সহগ ছিল ০.৪৬৭, যা ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপে বেড়ে ০.৪৯৯ হয়েছে।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

রফতানি-আমদানিতে ধাক্কা, ডলারের উল্লম্ফন

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় ক্ষেত্রেই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

অন্যদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০৬ সালে এক ডলারের বিনিময় হার ছিল ৬৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

মধ্যম ঝুঁকির দেশে বাংলাদেশ

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন আর ‘নিম্ন ঝুঁকির’ দেশ নয়। ঋণ পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশের ঝুঁকির অবস্থান ‘মধ্যম’ পর্যায়ে নেমে এসেছে।

২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘ব্যাংক খাত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তবে তার উপস্থাপিত পরিসংখ্যান বলছে, সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং ব্যাংক খাতের গভীর সংকট।’’