ঋণনির্ভরতার বাজেট: প্রবৃদ্ধি বনাম ঝুঁকির ভারসাম্য

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটকে গত অর্থবছরের তুলনায় একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক খাতের অগ্রাধিকার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেটের আকার ও কাঠামোগত পরিবর্তন

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।

ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকা। অপরদিকে পরিচালন ও অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

এবার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ কিছুটা কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামানো হয়েছে।

সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে অগ্রাধিকার

খাতভিত্তিক বরাদ্দে সামাজিক অবকাঠামো খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা এবং সাধারণ সেবা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।

রাজস্ব আয়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা

আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য উৎস থেকে আসবে বলে সরকারের আশা। তবে রাজস্ব আহরণের এই উচ্চ লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ইতোমধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে।

ঘাটতি অর্থায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে, যার মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। ফলে নিট বিদেশি ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ও বেসরকারি খাতের উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক উৎস ও বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো শক্তিশালী না হলে ব্যাংক নির্ভরতা আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

ঋণ পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ইতোমধ্যেই প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত দুই দশকে এই ঋণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ ব্যবহার বাড়লেও তার দক্ষ ব্যবস্থাপনা না হলে ভবিষ্যতে সুদ ও ঋণ পরিশোধ ব্যয় বাজেটের বড় অংশ দখল করবে।

সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক খাতে কৌশলগত পরিবর্তন

এবার সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

অন্যদিকে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ কিছুটা কমানো হলেও এখনো বড় নির্ভরতা বজায় রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কাঠামো বেসরকারি বিনিয়োগে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে।

সিপিডির পর্যবেক্ষণ: বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

বাজেট ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সিপিডি বলেছে, বাজেটের আকার ও উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে বাজেট কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বিশেষ করে জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকায় দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছে।

সার্বিক মূল্যায়ন

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের বাজেট একদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়েছে, অন্যদিকে উচ্চ ঘাটতি ও ঋণনির্ভর অর্থায়ন কাঠামো অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর—রাজস্ব আহরণের বাস্তবায়ন, বৈদেশিক ঋণ প্রবাহের স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংক খাতের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার।

সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হলেও, এর বাস্তবায়ন সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।