স্বস্তি, চাপ নাকি উচ্চাভিলাষ?

গোলাম মওলা
১১ জুন ২০২৬, ২৩:৫৯আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ১০:২৯

দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়—এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আগামী কয়েক বছরের উন্নয়ন কৌশলের রূপরেখা।

এবারর বাজেটের প্রতিপাদ্য ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা।’ এই প্রতিপাদ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সরকারের মূলবার্তা। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ধরনের ব্যয়ের পরিকল্পনা। তবে প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের অর্থ আসবে কোথা থেকে? আর এর প্রকৃত সুফল কি সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে?

বিশাল বাজেট, বিশাল ঘাটতি

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমবে, শিল্প সম্প্রসারণ ব্যাহত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এটিই সম্ভবত বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ

গত কয়েক বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্য থেকে বাসাভাড়া, শিক্ষা থেকে চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। এ বাস্তবতায় সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একইসঙ্গে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো বলছে, শুধু করছাড় বা শুল্ক সমন্বয় করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানির দাম, ডলারের বিনিময় হার, ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনা—সব কিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ বাজেট মূল্যস্ফীতি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু তার সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।

মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তি, কিন্তু সীমিত

বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এটি নিঃসন্দেহে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে একইসঙ্গে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের কিছু সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র, জীবন বিমা, ডিপিএস ও অন্যান্য সঞ্চয়মুখী খাতে করছাড় কমানোর ফলে অনেক করদাতা পূর্বের মতো সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ সরকার এক হাতে কর-স্বস্তি দিয়েছে, অন্য হাতে কিছু সুবিধা প্রত্যাহার করেছে।

করজাল সম্প্রসারণের নতুন যুগ

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন। নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে ব্যাংক, ভূমি অফিস, ইউটিলিটি সংস্থা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের যুক্তি, এতে কর ফাঁকি কমবে এবং করদাতার সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি নতুন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

নিত্যপণ্যে স্বস্তির বার্তা

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য সরকার বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড় দিয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, লবণ, ভোজ্যতেল এবং কৃষি বীজসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো হয়েছে। মসলাজাতীয় পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। খেজুর আমদানিও শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের বাজার বাস্তবতা বলছে, কর কমলেই দাম কমে না। মধ্যস্বত্বভোগী, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং বাজার সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় করছাড়ের সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। সুতরাং, এই ঘোষণার কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাজার তদারকির ওপর।

স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন গুরুত্ব

এবারের বাজেটের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে একাধিক করছাড় দেওয়া হয়েছে।

হার্টের রিংয়ের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করায় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হেমোডায়ালাইসিস টিউবিং সেটসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীর ওপর করছাড় দেওয়া হয়েছে। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক, থ্যালাসেমিয়া ও জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করার প্রস্তাবও এসেছে। যদি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি লাখো পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষা খাতে রূপান্তরের ইঙ্গিত

শিক্ষা খাতকে এবার শুধু ব্যয় খাত হিসেবে নয়, বিনিয়োগ খাত হিসেবে দেখছে সরকার। মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, মিড-ডে মিল কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর— সব মিলিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নতুন অর্থনীতি ও তরুণদের জন্য বার্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রথমবারের মতো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল সেবা খাতকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তিপণ্যে করছাড় এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার তরুণদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সরকার প্রচলিত শিল্পনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে চায়।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর

প্রায় ১১ বছর পর নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা নিঃসন্দেহে বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি। সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য অতিরিক্ত বিপুল ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে এবং ভোগব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছু চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কালোটাকা: পুরোনো বিতর্কের নতুন সংস্করণ

বাজেটের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ সম্ভবত অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা প্রদর্শনের সুযোগ। সরকার বলছে, আবাসন খাতের বাস্তব লেনদেনকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, যারা বছরের পর বছর নিয়মিত কর দিয়েছেন, তাদের তুলনায় অঘোষিত সম্পদের মালিকদের জন্য এটি কি বিশেষ সুবিধা নয়? বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এবারের বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়।

শিল্প সুরক্ষা বনাম ভোক্তার ব্যয়

স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সরকার বেশ কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে। ফলে বাইসাইকেল, কিছু আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য, কাজুবাদাম, বিদেশি মধু, এলপিজি সিলিন্ডার, বিদেশি টাইলস, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। সরকারের যুক্তি, দেশীয় শিল্প রক্ষা করতে হলে কিছু ক্ষেত্রে আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতেই হবে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে এর চাপ ভোক্তাকেই বহন করতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তায় সম্প্রসারণ

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে শক্তিশালী করে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিপুল অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কতটা পৌঁছাবে?

বাজেটের আসল পরীক্ষা এখন শুরু

বাজেট ঘোষণা করা সহজ, বাস্তবায়নই কঠিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নের ঘাটতিতে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এবারও একই চ্যালেঞ্জ সামনে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে—সব একসঙ্গে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরতা এবং কিছু খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন শেষে তিনি বলেন, ‘‘বাজেটে মানবিক অর্থনীতি, উদারীকরণ ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, যা ইতিবাচক।’’ তবে তিনি মনে করেন, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘‘করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সময়োপযোগী ও ইতিবাচক।’’ এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে বাজেটের আকার ও অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করে সিপিডির এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‘রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে।’’ একইসঙ্গে বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাশিত মাত্রায় না এলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘‘এবারের বাজেটে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। সরকারের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে, ফলে বিনিয়োগ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’

ড. মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘‘এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং বিকল্প ফান্ড ফ্লো নিশ্চিত করা।’’

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বলে মনে করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘‘শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর কমানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তিপণ্য ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর-সুবিধা এবং বিনিয়োগ সহজীকরণের উদ্যোগ ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘৩০ শতাংশের বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন এবং ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’’ ডিসিসিআইর মতে, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতার ওপর।

আগামী এক বছর পর মূল্যায়ন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এক কথায় বলা যায়—‘কল্যাণমুখী উচ্চাভিলাষ ও আর্থিক বাস্তবতার সমন্বয়ের চেষ্টা।’ এখানে আছে মধ্যবিত্তের জন্য করস্বস্তি, রোগীর জন্য চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, শিক্ষার্থীর জন্য নতুন সুযোগ, উদ্যোক্তার জন্য প্রণোদনা, কৃষকের জন্য সহায়তা এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির আশা।

আবার একইসঙ্গে আছে বিশাল বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভর অর্থায়ন, করজাল সম্প্রসারণ, কিছু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা এবং কালোটাকা বৈধ করার বিতর্ক।

সুতরাং, এই বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সংসদের করতালিতে নয়, বাজারের দামে; বক্তৃতার প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তবায়নের সাফল্যে। আগামী এক বছরই বলে দেবে—এটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরানোর বাজেট, নাকি আরেকটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির দলিল। 

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়াই সরকারের লক্ষ্য: অর্থমন্ত্রী
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
বন্যা মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজের নির্দেশ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর
সর্বশেষ খবর
একটু লাল, একটু গোলাপি: ঠোঁটের রঙে আজ উৎসব
কোন কোন দেশে ভিসা ছাড়াই ঘুরতে যাবেন
পাঠ্যবই বদলাচ্ছে, কিন্তু গন্তব্য কোথায়? 
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলার ধরন নিয়ে জার্মান কিংবদন্তি, ‘ওটা ফুটবলই নয়’
সর্বাধিক পঠিত
মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ: তিন খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ
ফেসবুকে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা, অবশেষে ধরা পড়লো প্রতারক
২৩ বছর ধরে বন্ধ কারখানা এখন রফতানিমুখী, চাকরি পেলো ৩৫০০ মানুষ
নাসীরুদ্দীন-সারজিসের ওপর হামলা কেন, যা বলছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা
একনেকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার আট প্রকল্প অনুমোদন