জাতীয় সংসদে দুইদিন ধরে মাইক্রোওয়েভ ওভেন আর ওয়াশিং মেশিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একজন সংসদ সদস্য নিজের ব্যবহারের জন্য চাচ্ছেন, অন্যদিকে আরেকজন সেগুলো দেওয়ার কথা বলছেন। তবে এত কিছুর মধ্যে এই আলোচনা কীভাবে আসলো। বুধবার (১৭ জুন) সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি ফ্ল্যাটগুলোর দরজা-জানালায় পর্দা লাগানোরও দাবি জানিয়েছেন। তার এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিতে চাইলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। আন্দালিব পার্থের ওভেন দিতে চাওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। আর বিষয়টি নিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, আর বাড়াবাড়ি তো কোনও দরকার নাই।
বুধবার নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও এই মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সংসদ সদস্যরা অনেক টাকার সম্পূরক বাজেটও পাস করেছেন। কিন্তু এই সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোয়, থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার দরজা-জানালার পর্দা এখনও পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি।’’
স্পিকারকে উদ্দেশ করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা শুনেছিলাম যে, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোয় একটি করে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’’
আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, “পয়েন্ট অব অর্ডার সংসদ চলাকালীন বা সংসদের ব্যাপারে হতে হবে। এজন্য আমি মনে করলাম যে, এটা ব্রডার কনটেক্সটে সংসদকে ইফেক্ট করে। অনেক কষ্টের পরে পার্লামেন্ট আমরা পেয়েছি এবং আমি আমার প্রথম স্পিচেও বলেছিলাম যে, বেস্ট পার্ট অব দ্য পার্লামেন্ট এই যে, এখানে স্বৈরাচারের কোনও দোসর বা ফ্যাসিস্টের কেউ নেই। গত পার্লামেন্টে শুধু গণতন্ত্রের হত্যা হয়নি, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডকে সাংঘাতিকভাবে নষ্ট করেছে। আমরা দেখেছি— এখানে মমতাজ থেকে আরম্ভ করে এখানে গান হয়েছে। এখানে অন্য কিছু হয়েছে।”
পার্থ বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, ডাইরেক্টলি ওদিকে না গেলেও কিছু কিছু জায়গায় কিন্তু আমরা ওদিকে চলে যাচ্ছি। আমরা কিন্তু মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছাড়াও অ্যাম্বাসেডরস অব দ্য পার্লামেন্ট। আমরা যখন বাইরে কোথাও যাই পার্লামেন্টকে রিপ্রেজেন্ট করি। কালকে পরশু দিন পার্লামেন্ট থেকে যাবারও পরে আমি অনেক টেলিফোন পাই এবং সেখানে আমি ডিফেন্ড করার চেষ্টা করি এবং ডেইলি স্টার নিউজ করে— জামায়াত এমপির ডিমান্ডস ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, অ্যান্ড কার্টিনস এইটা আমাকে অনেক লজ্জা দেয়। আমি মনে করি, এই পার্লামেন্টকে অনেক লজ্জা দেয়— একটা মেম্বার অব পার্লামেন্ট এখানে দাঁড়িয়ে যেখানে জনগণের কথা বলবে, যেখানে বিভিন্ন জনগণের দাবির কথা বলবে, সেখানে একজন মেম্বার অব পার্লামেন্ট দাঁড়িয়ে উনি ওয়াশিং মেশিন পেলো না, মাইক্রোওয়েভ পেলো না, কার্টিনস পেলো না— সেই ব্যাপারে দাঁড়িয়ে কথা বলবে।”
১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ঘোষণা স্মরণ করে দিয়ে পার্থ সংসদে বলেন, “যেখানে আবার বলা হয় যে, আমরা গাড়ি নেবো না, প্লট নেবো না— আমার কাছে মনে হয় যে, আসলেই যদি গাড়ি আর প্লট যখন তারা বাদ দিলো, তখন ওনাদের বুকের ওপরে কত বড় পাথর চাপা দিয়ে বাদ দিতে হলো যে, মাইক্রোওয়েভ আর ওয়াশিং মেশিনের জন্য এই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে যে, এই স্ট্যান্ডার্ড আর স্ট্রাচার আমাদেরকে মেনটেইন করা উচিত।”
পার্থ বলেন, “আমি জেনারেলি এটা বলছি যে, আমি খুব সিরিয়াসলি বলছি বা তারপরও যদি আমার ভাই যেহেতু কমেন্ট করেছেন উনি চান। আমি তাকে এমব্যারেস না করে আগামীতে যদি তার পর্দা বা মাইক্রোওয়েভ লাগে আমি আমার তরফ থেকে তাকে একটা মাইক্রোওয়েভ দিতে চাই এবং আমি প্রধানমন্ত্রীকে রিকোয়েস্ট করতে চাই— যদি ওয়াশিং মেশিনটা উনি দেন এবং হোম মিনিস্টার থাকলে আমি বলতাম যে, উনি পর্দাটা যদি কিনে দেন, তাহলে তার সংসারটা আমরা বুঝায়ে দিতে পারতাম। তারপরও যদি আমার পার্লামেন্টকে উনি এমব্যারেস না করতেন।”
আন্দালিব রহমান পার্থ জামায়াতের সংসদ সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে মাইক্রোওভেন দিতে চাওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘মাইক্রোওভেন ওনার কাছে কে চেয়েছে’
পার্থ এর বক্তব্যের প্রতিবাদে জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, মাননীয় সদস্য (পার্থ) পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, আপনি (স্পিকার) তো প্রথমেই নাকজ করেছেন যে, এটা পয়েন্ট অফ অর্ডারের বিষয় না। দুই নম্বর, একজন সদস্য ((জামায়াত নেতা মজিবুর রহমান) তিনি সবার জন্য একটা বিষয় চেয়েছে। আপনি (স্পিকার) রাইটলি বলেছেন যে, এটা হাউজে না হলে এটার জন্য কমিটি আছে ওখানে বললেই হতো। কিন্তু তিনি এইটাকে সূত্র ধরে আবার আরেকটা যে গাড়ি বাড়ি সব নিয়ে আসলেন। উনি তো আমি মনে করি, একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আমার নিজের থেকে অফারও দিয়ে দিলেন যে, আমি সব দিয়ে দেবো। ওনার কাছে চাইছে নাকি কেউ যে, উনি দেবেন? আমার মনে হয় যে, আমাদের মানসিকতাগুলা এমন হওয়া উচিত— যেটা এখানে দাঁড়িয়ে অন্তত কেউ কারো সম্মানে আমরা আঘাত করবো না।
বিরোধী দলীয় নেতা আশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা আশা করবো যে, আমিসহ আমরা সকলেই আগামীতে এগুলোর প্রতি আরও যত্নশীল হব। ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার।
এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা এটা নিয়ে কোনও বিতর্ক হোক এটা আমি চাই না। আপনি অন্য কোনও বিষয়ে বললে বলেন। এটা সম্পর্কে আর শুনতে চাই না। এটা আরেকটি কথা আমি বলি আপনাদের কথা। আর আর যেভাবে আপনি একজন সদস্যকে অফার করেছেন তাকে দেবেন। এটাও তার জন্য একটি ডিসরেসপেক্টফুল মনে হতে পারে। উনি নিজের জন্য চান নাই। সকল সংসদ সদস্য যারা বসবাস করে সংসদের সরকারি বাড়িতে তাদের জন্য বলেছেন। সুতরাং, এটা নিয়ে এই বিষয়টা নিয়ে আর বিতর্ক না হোক এটা আমি চাই। মাননীয় নেতা এরপরে আর বাড়াবাড়ি তো কোনও দরকার নাই। বিরোধী দলের নেতা আপনি তো এই সম্পর্কেই বলবেন তো।
আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের পর এবং বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য দেওয়ার আগে স্পিকার বিষয়টি নিয়ে রুলিং দেন। এ সময় স্পিকার বলেন, বাজেট সেশনের ওপরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন। বাজেট সেশন এমন একটি সেশন বাজেট বক্তব্য এমন একটি বক্তব্য সেখানে অনেক বিষয়ে বক্তব্য রাখা যায়। এবং তাছাড়া একজন সদস্য তার সুবিধা অসুবিধার কথা বলেছেন। আমি মনে করি, এটা সংসদে না বললেও ভালো হতো। কিন্তু এটা বলে এমন কোনও গহীত অপরাধও তিনি করেন নাই। আমাদের হাউস কমিটি আছে সেখানে আমরা সংসদ সদস্যদেরকে আসবাব পত্র ইত্যাদি আমরা দিয়ে থাকি। সেই হিসেবে তিনি যদি সকল সদস্য তিনি তার নিজের জন্য চান নাই। সকল সংসদ সদস্যদের জন্যই যারা হাউজে সংসদের দেওয়া ভবনে যারা বসবাস করে তাদের সম্পর্কে বলেছে। সুতরাং এটা এমন কোনও গর্হিত অপরাধ হয়নি। তবে আমি মনে করি, না বললেই ভালো হতো। এতে জনমনে অন্য ধরনের ধারণা হতে পারে। তবে এটি তো তাদের প্রাপ্য হতে পারে। এটা এমন কিছু বড় জিনিস নাই। এই সামান্য জিনিস নিয়ে একে আর তর্ক বিতর্ক করতে চাই না। কারণ এটি নিয়ে বিতর্ক করলে আবার খারাপ মেসেজ যাবে বাইরে। ভবিষ্যতে বক্তব্য রাখার সময় আমরা সবাই কেয়ারফুল থাকবো। যেসব জিনিস পার্সোনালি আপনি যদি হাউস কমিটির চেয়ারম্যান আছেন, সদস্যরা যদি তাকে জানান তারাই এটার সমাধান করতে পারবেন।