সংসদে বাজেট আলোচনায় মূল বিষয় ছাড়িয়ে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’

গত ১১ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নিয়ম অনুযায়ী বাজেট পাসের আগে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা মতামত তুলে ধরছেন। তবে অতীতের মতো এবারও অনেক সংসদ সদস্য বাজেটের মূল আলোচনার বাইরে নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন।

প্রতিপক্ষের চরিত্রহনন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি হিসেবে ট্যাগ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেই অনেকেই বক্তব্য শেষ করছেন। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সদস্যরাই রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে। অনেকে বলছেন, অতীতেও সংসদে গান পরিবেশন কিংবা সরকারপ্রধানের স্তুতিগান গেয়ে সময় নষ্ট করা হতো। এখনও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নানা ট্রল।

অথচ সংসদের অধিবেশনের প্রতি মিনিট পরিচালনায় ব্যয় হয় ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট আলোচনায় গিয়ে অনেক সংসদ সদস্য ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাইছেন। বাধ্য হয়ে স্পিকারকে কিছু বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে (এক্সপাঞ্জ) বাদ দিতে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে সংসদের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অতীতেও সংসদে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করা হতো। এখন বিষয়ভিত্তিক কিছু আলোচনা হলেও প্রায়ই আগের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে হেয়প্রতিপন্ন করে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলে সংসদের সময় নষ্ট করা হচ্ছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে আরও কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের সংসদ সদস্যদের কার্যক্রমের বিষয়ে নজর রাখতে হবে। শুধু টেবিল চাপড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই, সংসদ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন নিয়ে ত্রিমুখী বিতর্ক

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে পর্দা, ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি জানান। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এরপর ১৯ জুন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ভোলা–১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ নিজের উদ্যোগে ওই সংসদ সদস্যকে পর্দা ও মাইক্রোওভেন উপহার দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

তার অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তিনি নিজেই মাইক্রোওভেন দিতে প্রস্তুত।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, পার্থর বক্তব্য পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন বিষয় আসতে পারে এবং মিজানুর রহমান কোনো গর্হিত অপরাধ করেননি। তিনি নিজের জন্য নয়, সব সংসদ সদস্যের সুবিধার কথাই বলেছেন।

পার্থের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ ধরনের বিষয়ে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি। কাউকে বিব্রত না করে সংযত থাকা উচিত এবং ভবিষ্যতে সবাইকে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সামান্য একটি বিষয় নিয়ে সংসদে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

নিজের জন্মের ১০ বছর আগে বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দাবি

জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় নিজের জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেন নীলফামারী–৪ (সৈয়দপুর–কিশোরগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম।

১৪ জুন সংসদে তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা–চাচা) সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা।’

পরে সংবাদ প্রকাশিত হয়, হলফনামা অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পর তিনি নিজের বক্তব্যের জন্য ভুল স্বীকার করেন।

বোরকা নিয়ে মন্তব্যে সংসদের বাইরেও উত্তাপ

গত ১৫ জুন সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন কুমিল্লা–১০ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি বোরকা পরিহিত নারী সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘বুঝলাম না তো, কারা আপনারা?’

এ সময় বিরোধীদলের সব সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে ওই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান। কয়েক মিনিটের জন্য সংসদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

পরে বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, সংসদে বিরোধীদলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য অমার্জনীয় অপরাধ।

মনিরুল হক চৌধুরীর ওই বক্তব্য সংসদের বাইরেও উত্তাপ ছড়ায়। কয়েকটি সংগঠন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করে।

মামুনুল হকের ‘মুতা বিয়ে’ নিয়ে আলোচনা

গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনায় হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের ব্যক্তিগত জীবন, পরকীয়া ও ‘মুতা বিয়ে’ প্রসঙ্গ তোলেন ঢাকা–১ আসনের সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক।

সরকার ও বিরোধী দলের আপত্তির মুখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ওই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন।

স্পিকার বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ সংসদে আলোচিত হোক, তা তিনি চান না। এ ছাড়া যাঁর সংসদে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তাঁর সম্পর্কে অভিযোগ তোলাও সমীচীন নয়।

স্পিকারের রুলিংয়ের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ওই সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে মিথ্যা ও আপত্তিকর বলে মন্তব্য করেন।

এ ছাড়া সংসদে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বক্তব্য দেওয়া এবং কোরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যার অভিযোগও উঠেছে।

কেন হচ্ছে, কী করতে পারেন স্পিকার

সংসদ সদস্যরা কেন এমন বক্তব্য রাখছেন এবং কার্যবিবরণী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়া ছাড়া স্পিকারের আর কী করার আছে—এসব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সংসদীয় বিধি অনুযায়ী, স্পিকার সদস্যদের যেকোনো বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা বাদ দিতে পারেন।

বিধি ১৮৪ অনুযায়ী, কোনো বক্তব্য বা শব্দ আপত্তিকর, অশালীন, অবমাননাকর বা সংসদীয় শিষ্টাচারবহির্ভূত মনে হলে স্পিকার তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। আর বিধি ১৮৬ অনুযায়ী, তিনি যেকোনো সময় অসংসদীয় শব্দ বা বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার ক্ষমতা রাখেন।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সময় অনেক কিছু পরিবর্তন করে। যেমনটি হয়েছে ১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালের আন্দোলনে। প্রতিটি আন্দোলনের পর মানুষের এক ধরনের প্রত্যাশা থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেটি নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, আলোচনা ছাড়াই বাজেটে কর আরোপ করা হয়েছে। সংসদে এসব অসংগতি নিয়ে আলোচনা না হয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে। 
তার মতে, স্পিকার চাইলে সংসদ সদস্যদের আচরণ ও বক্তব্য বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। প্রথমত, তাকে কঠোর হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে মাইক বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। 

উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের আচরণের জন্য সংসদ সদস্যকে অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ারও নজির রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রেজারি বেঞ্চ ও স্পিকারকে দায়ী করছে জামায়াত

সংসদ সদস্যদের অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য নিয়ে সমালোচনাকে ভিন্নভাবে দেখছে জামায়াত। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বাজেটের বাইরে বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে প্রায়ই উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে তাদের কিছু সদস্যও কিছু কথা বলেছেন। যদিও এসব বক্তব্যকেও তারা সমর্থন করেন না।

তার মতে, বর্তমান স্পিকার দুর্বল। তিনি কঠোরভাবে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, সঠিক রুলিংও দিতে পারছেন না। ফলে যে কেউ যখন-তখন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় কথা বলছেন।

তিনি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন।

যা বলছে বিএনপি

সংসদের বাজেট অধিবেশনে মূল আলোচনার বাইরে বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অতীতের তুলনায় এবারের সংসদে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কারণ আগে সারাক্ষণ প্রতিপক্ষকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা হতো। সেই অর্থে এখন তেমন সংসদীয় আচরণ হচ্ছে না।

তবে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো সংসদ সদস্য মাঝে মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।

তার দাবি, ক্ষমতাসীন দল অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় দিচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলও সংসদে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে, যা সংসদীয় রীতিনীতির সঙ্গে যায় না। তার মতে, এ ক্ষেত্রে সবারই দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করা জরুরি।