অর্থ বিল পাস, যেসব পরিবর্তন এলো 

জাতীয় সংসদে ২০২৬ সালের অর্থবিল পাসের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে আগের মতোই টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে। 

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ‘অর্থ বিল ২০২৬’ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হাফিজ উদ্দিন বীর বিক্রম।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং কয়েকটি প্রস্তাব সংশোধনের সুপারিশ করেন। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধিত আকারে অর্থবিল পাসের প্রস্তাব করলে সংসদ তা কণ্ঠভোটে অনুমোদন দেয়। 

এর ফলে আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনও কর দিতে হবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা।  

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না

প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ছিল। ব্যবসায়ী, সাধারণ গ্রাহক ও বিভিন্ন মহলের আপত্তির পর সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফলে আগের নিয়মেই টিআইএন ছাড়াই ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে। 

একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন এবং নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে।

জমি নিবন্ধনের বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার 

প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনের নামে অর্থবিলে একটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এটি কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে— এমন সমালোচনার মুখে পুরো বিধানই প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে জমি নিবন্ধন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসান ঘটেছে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমে অর্ধেক 

প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ আয়কর বহাল রাখা হলেও সংসদে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট বড় ধরনের কমানো 

অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ডিজিটাল বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসা, স্টার্টআপ ও অনলাইন উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বর্ণ ব্যবসায় নতুন ভ্যাট কাঠামো

স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারের ভ্যাট কাঠামো নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব অলংকার কেনার সময় উৎসে ৫০ পয়সা হারে কর কর্তনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

মাছ ও টেলিযোগাযোগ খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার

মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজস্ব ভাগের ওপর আরোপিত ভ্যাটও বাতিল করা হয়েছে।

দেশীয় শিল্পে শুল্ক-কর ছাড় 

দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে চিংড়িশিল্প, ওষুধশিল্প, বৈদ্যুতিক তার উৎপাদন, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, পরিশোধিত তামা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো কিংবা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কম লভ্যাংশ দিলে অতিরিক্ত কর 

তালিকাভুক্ত কোনও কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই বিধানের বাইরে থাকবে। 

এছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধন বা বার্ষিক বিক্রয় রয়েছে— এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংঘের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

ব্যবসার ক্ষেত্রে বিআইএন বাধ্যতামূলক

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

বিদেশি সেবার ভ্যাট আদায় করবে ব্যাংক 

বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। 

এছাড়া প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির জন্য পৃথক সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। 

অপরদিকে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা পেলে তা মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ওপর কর আরোপ করা হবে। 

ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি

অর্থবিল পাসের সময় আনা সংশোধনীগুলোর মধ্যে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ব্যাংক হিসাব ও জমি নিবন্ধনে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানোকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানো দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। 

অর্থ বিল পাসের আগে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান, অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, মো. আলী আসগর, মো. আব্দুল গফুর ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালসহ বেশ কয়েকজন সদস্য বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে ঋণের আশ্বাসের বাস্তবতার মতো নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। তবে সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। 

পরে সংসদ সদস্যদের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বাকিগুলো কন্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।