বাংলাদেশের জনসংখ্যা আসলে কত?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা আসলে কত—প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও এর উত্তর এখন আর ততটা সরল নয়। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্তে জনসংখ্যার হিসাবে দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। কোথাও জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি, কোথাও আবার ১৬ কোটির ঘরে। একই দেশের জনসংখ্যা নিয়ে এমন ভিন্ন ভিন্ন হিসাব শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাসহ নানা খাতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করছে। ফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে, বাংলাদেশের প্রকৃত জনসংখ্যা আসলে কত?

এমন প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার (১১ জুলাই) পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রভাব, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এর মূল লক্ষ্য।

১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি ছাড়িয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গভর্নিং কাউন্সিল ১১ জুলাইকে ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯০ সাল থেকে দিবসটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মোট জনসংখ্যা নয়, বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার সঠিক কাঠামোও জানা জরুরি। কারণ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনাসহ প্রায় সব নীতিনির্ধারণই নির্ভর করে নির্ভুল জনসংখ্যার তথ্যের ওপর। কিন্তু তথ্যের এই অমিল নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—পরিকল্পনা প্রণয়নে কোন তথ্যকে ভিত্তি ধরা হবে?

জরিপগুলো যা বলছে

বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপে একক কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যেও সেই পার্থক্য স্পষ্ট।

ইউএনএফপিএর ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, যা দেশের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ। এটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট-টিএফআর) ২ দশমিক ১ উল্লেখ করা হয়েছে, যা মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে এখনও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের হার তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে বাল্যবিবাহ, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সীমিত ব্যবহার এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিবিএসের জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার। আবার বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ বিভিন্ন জরিপের ফলাফলেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

কেন এই পার্থক্য

বিবিএস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যের মধ্যে পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইউএনএফপিএ ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে না। তারা মোট প্রজনন হারসহ (টিএফআর) বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে জনসংখ্যার একটি প্রক্ষেপণ (প্রজেকশন) তৈরি করে এবং সেখান থেকে বর্তমান জনসংখ্যার হিসাব নির্ধারণ করে।

তিনি বলেন, অন্যদিকে বিবিএসের ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভেও দেশের প্রতিটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে না। তারা নমুনাভিত্তিক (স্যাম্পল) জরিপ পরিচালনা করে এবং সেখান থেকে পরিসংখ্যান তৈরি করে। এটি পরিসংখ্যানগত পদ্ধতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে এজন্য তথ্য সম্পূর্ণ ভুল হয়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। বরং ব্যবহৃত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি কতটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তার ওপর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে জনশুমারি হয়েছে। এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। ইউএনএফপিএ ওই তথ্যের সঙ্গে বর্তমান টিএফআরসহ বিভিন্ন সূচক যুক্ত করে বর্তমান জনসংখ্যার একটি প্রক্ষেপণ দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিবিএসের পূর্ণাঙ্গ জনশুমারির হালনাগাদ তথ্য জানতে হলে পরবর্তী জনশুমারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সাধারণত ১০ বছরের আগে নতুন জনশুমারি করা হয় না এবং এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি কার্যক্রম।

তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে বিবিএস প্রতিবছর ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভে পরিচালনা করে, যেখান থেকে জনসংখ্যার একটি ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সংখ্যাও অনেক সময় ইউএনএফপিএর প্রক্ষেপণের তুলনায় কিছুটা কম দেখা যায়।

কোন তথ্যকে বেশি নির্ভরযোগ্য ধরা উচিত

বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত জনসংখ্যার তথ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কোন তথ্যকে বেশি নির্ভরযোগ্য ধরা উচিত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, উদ্দেশ্য এবং পরিসংখ্যানগত প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিটি তথ্যেরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই কোনো একক সংখ্যাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার পরিবর্তে তথ্যের উৎস ও প্রণয়ন পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়েই তা মূল্যায়ন করা উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন বলেন, একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ইউএনএফপিএ ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে না; তারা প্রক্ষেপণের মাধ্যমে হিসাব করে। আবার বিবিএসও প্রতিটি পরিবারে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে না; তারা নমুনাভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করে। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যানগত সীমাবদ্ধতা থাকে।

তিনি বলেন, আমাদের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, রাষ্ট্র যেন এসব তথ্য তৈরির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করে। অতীতে যদি কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বা নির্দেশনার কারণে তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল থেকে থাকে, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে বিবিএসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে।

তার ভাষ্য, সরকারেরও প্রশ্ন করা উচিত—কেন তথ্যে এত গরমিল হচ্ছে। শুধু বিবিএসের তথ্য বলেই সেটিকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। তথ্যের যথার্থতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত যাচাই ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কেন সঠিক জনসংখ্যার তথ্য জানা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক জনসংখ্যার তথ্য শুধু মানুষের সংখ্যা জানার জন্য নয়, কার্যকর রাষ্ট্রপরিকল্পনারও ভিত্তি। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষাসহ প্রায় সব ধরনের নীতিনির্ধারণ নির্ভর করে নির্ভুল জনসংখ্যার তথ্যের ওপর।

প্রকৃত জনসংখ্যার তথ্য না থাকলে রাষ্ট্রের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে—এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতক তৈরি হয় মাত্র প্রায় ১০ হাজার। কিন্তু বাস্তবে কতজন দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কতটুকু কিংবা কতজন শিক্ষার্থী কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য না থাকলে কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, একইভাবে বাল্যবিবাহের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি এখন ২ দশমিক ৩ বা ২ দশমিক ৪-এর মধ্যে রয়েছে, যেখানে রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ফার্টিলিটি হওয়ার কথা ২ বা তার নিচে। এ হার বেড়ে থাকার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ।

তার ভাষ্য, কয়েক বছর আগে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫০ শতাংশের বেশি, যা বর্তমানে প্রায় ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমান গতিতে চললে শুধু বিদ্যমান কর্মসূচির মাধ্যমে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে আরও ২০০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। অথচ বাল্যবিবাহ কমাতে যেসব কার্যকর উদ্যোগ বা উপকরণ ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের হাতে নেই। গ্রামের মানুষের মধ্যে সচেতনতা কতটা তৈরি হয়েছে, কতজন বাস্তবে বাল্যবিবাহকে প্রত্যাখ্যান করছে; এসব তথ্যও অনুপস্থিত।

তিনি বলেন, তাই জনসংখ্যাসংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভুল তথ্য ছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জনসংখ্যার তথ্য যথাসম্ভব নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন। কারণ বৈদেশিক ঋণ, বৈদেশিক সহায়তা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা কিংবা কোন শ্রেণির মানুষের জন্য কী ধরনের নীতি নেওয়া হবে; এসবই নির্ভর করে জনসংখ্যার কাঠামো ও সঠিক পরিসংখ্যানের ওপর।