সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের বিরোধীতা করে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। সোমবার (১৩ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশন চলাকালে ৯টা ২৫ মিনিটে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকের নেতৃত্বে ওয়াকআউট করে দলটি। এর আগে তিন দফা ওয়াকআউট করেছ বিরোধী দল ও জোট।
এর আগে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংবিধান সংশোধনের লক্ষে ১৭ সদস্যের সর্বদলীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন এবং সরকারি দল ও বাংলাদপশ জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করেন। পাশাপাশি এই কমিটিতে বিরোধী দলের ৫ জন সদস্যের নাম দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
এসময় বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, “সংসদ ভোট ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি। একটা আপনারা মানছেন, আরেকটা মানছেন না। সংবিধান এভাবে সংশোধন করা হলে গণভোটের রায়ের প্রতি অসম্মান করা হবে। আমরা সেটি করতে চাই না। এজন্য সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আমরা আগেও অংশ নিতে চাইনি। এখানে আমাদের কনসেপচুয়াল পার্থক্য আছে। এখনও অংশ নিতে চাই না।”
এরপর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব ভোটে দিলে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়াই বেআইনি। কারণ এই সংসদ গঠিত হয়েছে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। এই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়েছেন এবং সেই ভাষণের ওপর আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিয়েছে। এই সংবিধান অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সুযোগ নেই।
বিরোধীদলীয় নেতা যে পয়েন্টে ওয়াকআউট করছেন তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে, তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই লেজিসলেচারে যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা না হয়, তবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও দেশকে ওই বিতর্কিত সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। সুতরাং সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা এবং সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এই জাতিকে নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দুটি শপথ নিলে প্রথম শপথটিই তো অবৈধ হয়ে যায়। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুসারেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ীই সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারি ও বিরোধী উভয় দল আলোচনা করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম ও ধারাবাহিকতা অনুসারেই সংসদের প্রত্যেকটি অধিবেশন ও বৈঠক পরিচালিত হচ্ছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, “সংবিধানে কোথায় আছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়া যাবে?” তিনি একে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেন, “এটি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে আইনি উপদেষ্টার নথিতে পাস করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল যা প্রথম দিন থেকেই অবৈধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এবং তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি শপথের যে ফর্ম ছাপানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।”
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণভোটের যে আদেশ, যেটিকে ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রথম দিন থেকেই এখতিয়ার বহির্ভূত, ফ্রড অন কনস্টিটিউশন এবং কালারেবল লেজিসলেশন ছিল, যা রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কিছু ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী একক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ এখতিয়ার ও সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণকে অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে সংসদ সদস্যদের দিয়েছে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে, “জুলাই জাতীয় সনদে যে সমঝোতা হয়েছে তার চার ভাগের সাড়ে তিন ভাগ তারা মানেন, কিন্তু বাকি আধা খানি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হাত বাড়িয়েছে। বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটি করলে সংবিধান সংশোধন না করে তারা বসে থাকতে পারবেন না। আর সংবিধান সংশোধন না করলে জাতিকে শেখ হাসিনার দেওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা কেউ চায় না।”
অবিলম্বে এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংসদ ও সংসদের বাইরে বিস্তারিত আলোচনা ও বৈঠক করবেন। এরপর সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সুপারিশের ভিত্তিতে এই মহান জাতীয় সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বিরোধীদলীয় সদস্যগণ ইমোশনাল বা আবেগসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী বিল আনার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।”