কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ মাসের মাথায় অবশেষে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুসারে তার স্থলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সে কারণেই সর্বত্র এখন  আলোচনা, কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।

বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, নতুন রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন দলের তিন শীর্ষ নেতা ও একজন আমলা। তাদের মধ্য থেকেই একজনকে বেছে নিতে পারে সরকার। কারণ যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হিসেবে তাদের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তবে সবাইকে অবাক করে এর বাইরেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাউকে বেছে নেওয়া হতে পারে বলে দাবি করছেন সরকারি দলের কেউ কেউ।

আলোচনায় যারা

দুদিন ধরে দেশব্যাপী আলোচনা ও গুঞ্জনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে থেকেই আলোচনায় আসে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতির নাম।

এর মধ্যে ঘুরেফিরে চারটি নাম সামনে আসছে। তারা হলেন—বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আরেক সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।

বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্র থেকে এ বিষয়টি জানানো হয়েছে— যদিও এ নিয়ে কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

বিএনপি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির হাইকমান্ড মনে করে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও সিনিয়র নেতাদের প্রাধান্য দিতে চায় দলটি। আর আমলাদের মধ্যে কেউ হলে সেখানেও বিএনপির একান্ত অনুগত কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে।

মির্জা ফখরুল

বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রাম ও ক্লিন ইমেজের কারণে হাইকমান্ডের গুডবুকে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁওয়ের তৃণমূল থেকে ওঠে আসা এই নেতা ২০০১ সালে জোট সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে বিএনপির দুর্দিনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবেও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের কাউন্সিলে তাকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সেই থেকে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে এক ধরনের সন্তুষ্টি আছে। বিশেষ করে জেল-জুলুম ও নির্যাতন ভোগ করায় দলের হাইকমান্ডের কাছে তার জন্য এক ধরনের আস্থার জায়গা আছে। তাই রাষ্ট্রপতি পদ দিয়ে তাকে সম্মানিত করতে চায় দলটি। অন্যদিকে কোনও কারণে সরকারে দুর্দিন নেমে এলে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন বলে দলটির হাইকমান্ড মনে করেন—এমনটিই জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

নতুন রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। নিজ নির্বাচনি এলাকা কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষকের পদ ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ১৯৯১, ৯৬, ২০০১ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নির্বাচিত হন তিনি। বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনিও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হিসেবে দলের ভেতরেও তিনি সম্মানিত। এ ছাড়া বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারণে দল তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনায় রাখতে পারে।

ড. আবদুল মঈন খান

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে মোট চারবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তার বাবাও সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, ক্লিন মিষ্টভাষী হিসেবে ড. মঈন খানকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। সূত্রটি মনে করে, অতীতে একাধিকবার কৃতিত্বের সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিত্ব পালন করেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধারণা করা হচ্ছিল তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনও জায়গায় তাকে বসানো হয়নি। সে কারণে তাকেও  রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এম নাসিমুল গণি

রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে হঠাৎ আলোচনায় বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম নাসিমুল গণি। এর আগে অনেকের নাম এলেও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে তার নাম।

নাসিমুল গণি বাংলাদেশের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ২০২৪ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর পরই তাকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দেওয়া হয় হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের উচ্চতম পদ বাংলাদেশের ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১৯৮২ ব্যাচের একজন  সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরি শুরু করেন।

ইতোপূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের গণবিভাগের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির সূত্র জানায়, একজন দক্ষ আমলা হিসেবে তাকেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে পেতে চায় সরকার।

বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন এ নিয়ে নানা আলোচনা হলেও সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে কেউই সরাসরি মুখ খুলতে চাননি। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘‘সেটি সময়ই বলে দেবে।’’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে নির্বাচিত হবেন, সেটা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই দায়িত্ব পালন করবেন।’’

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া

৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। তবে ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।

মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।