শেখ হাসিনার পতনের পর যেমন ছিলেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৪ জুলাই ২০২৬, ২১:২৫আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ২১:২৫

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘অসুস্থতাজনিত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকাল ৪টার দিকে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বঙ্গভবনে তার অবস্থান ছিল অনেকটাই সীমিত এবং বিভিন্ন বিতর্কে তিনি আলোচনায় ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং পরে বিএনপি সরকারের প্রধানকেও শপথবাক্য পাঠ করান।

দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে ফেসবুকে একটি ছবিতে ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি ভূমিকা পালন করেন। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে তাকে বঙ্গভবনে অনেকটাই কোনঠাসা অবস্থায় থাকতে হয়। এমনকি ঈদের নামাজও জাতীয় ঈদগাহে আদায় করতে পারেননি।

অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া তার একাধিক সাক্ষাৎকারও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। এসব বিতর্কের মধ্যেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথবাক্য পাঠ করান। একই দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারাও তার কাছেই শপথ নেন।

৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, দেশত্যাগের আগে শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

তবে অভ্যুত্থানের আড়াই মাস পর একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের ‘দালিলিক কোনও প্রমাণ’ তার কাছে নেই। এ বক্তব্যের পর বিক্ষোভ শুরু হয়। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির বাসভবন এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তবে ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়নি। যদিও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ‘মিথ্যাচার’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

তখন আলোচনা ছিল, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। সেই শঙ্কা থেকেই বিএনপি তাকে অপসারণের বিরোধিতা করেছিল। পরে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।

২০২৬ সালের শুরুর দিকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও শপথবাক্য পাঠ করান তিনি। তবে তাকে ঘিরে বিতর্ক তখনও অব্যাহত ছিল।

বিএনপি সরকারের সময়

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রপতিকে ‘জুলাই গাদ্দার’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। তবে সাংবিধানিক বিধি রক্ষার প্রশ্নে সরকারি দল তখনও রাষ্ট্রপতিকে সমর্থন দেয়।

এরপর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যায় তাকে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের আগের প্রায় দেড় বছরে দেখা যায়নি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই সময়ে একরকম গৃহবন্দি থাকার অভিযোগও করেছিলেন তিনি। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তিনি হয়তো পূর্ণ মেয়াদই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এর মধ্যে ৯ মে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি। ১৮ মে দেশে ফেরার পর সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার পদত্যাগের আলোচনা শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে

১৯৪৯ সালে পাবনা শহরের জুবিলি ট্যাঙ্কপাড়ায় (শিবরামপুর) জন্মগ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার বাবা শরফুদ্দিন আনছারী এবং মা খায়রুন্নেসা।

১৯৬৬ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৮ সালে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭১ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন, যদিও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৫ সালে পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) সক্রিয় কর্মী ও সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্রপরিষদের জেলা সভাপতি হিসেবে পাবনায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় ২০ আগস্ট সামরিক আইনের ৭ ধারায় গ্রেফতার হন। প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান।

পরে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আইন পেশায় যুক্ত থাকার পর ওই বছর বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন। বিচার বিভাগে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন।

/এএইচএস/ইউএস/
সম্পর্কিত
পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারের দাবি এনসিপির
কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি
সংসদের বিরোধী দল কি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিতে পারে?
সর্বশেষ খবর
‘মেয়েটি গাজী নজরুলের সেবা করতে চেয়েছিল’, জামায়াতের আরেক এমপি
‘মেয়েটি গাজী নজরুলের সেবা করতে চেয়েছিল’, জামায়াতের আরেক এমপি
পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারের দাবি এনসিপির
পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারের দাবি এনসিপির
কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি
কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি
বালকদের ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী, বালিকাদের ঢাকা
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসবালকদের ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী, বালিকাদের ঢাকা
সর্বাধিক পঠিত
দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, দেখালেন নতুন পথ
দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, দেখালেন নতুন পথ
একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি, জামায়াতপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি, জামায়াতপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধে রেলওয়ের ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধে রেলওয়ের ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি