দেশের দুর্গম ও ফায়ার সার্ভিসের সেবাবঞ্চিত (গ্যাপ) এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ৯০০-এর বেশি করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি ফায়ার স্টেশন পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, বর্তমানে সারা দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশন চালু রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত সাড়াদান সক্ষম বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, এসব ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে প্রকল্প পরিচালকের অধীনে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
নতুন নির্মাণাধীন ১২টি ফায়ার স্টেশন হচ্ছে ঢাকার নবাবগঞ্জ, গাজীপুরের পূবাইল ও শিমুলতলী, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার ও নাঙ্গলকোট, নোয়াখালীর শিবপুর, ফেনীর দাগনভূঞা, যশোরের নারিকেলবাড়িয়া, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, হবিগঞ্জের আজমেরীগঞ্জ এবং জামালপুরের পিয়ারপুরে।
এ ছাড়া মাদারীপুর সদর, কুমিল্লা সদর, নোয়াখালীর মাইজদী ও চৌমুহনী, নওগাঁ সদর, পাবনার ঈশ্বরদী, সিলেট সদর এবং ময়মনসিংহ সদরের আটটি ফায়ার স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
ডিজি জানান, এর বাইরে রাজধানীর মিরপুর ও সদরঘাট এলাকায় দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সেবা সম্প্রসারণের জন্য ১০০টি ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ অ্যাম্বুল্যান্স সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে। মিরপুর-১০ এলাকায় আধুনিক ও ভূমিকম্প-সহনশীল সদর দফতর নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডসহ যেকোনো দুর্ঘটনায় প্রথম সাড়াদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে নতুন সরঞ্জাম যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে বাহিনীর বহরে বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতার ৬৮ মিটার টার্ন টেবল লেডার এবং রিমোট কন্ট্রোল ফায়ারফাইটিং ভেহিক্যাল রয়েছে। ভবিষ্যতে ফায়ারফাইটিং ড্রোন যুক্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য হাইড্রোলিক স্প্রেডার, ভাইব্রেটর ও সার্চ ভিশন ক্যামেরার মতো আধুনিক সরঞ্জামও রয়েছে।
জাহেদ কামাল বলেন, বহুতল ভবনে নিজস্ব স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। তবে উচ্চ ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণে সব বিভাগীয় শহরে বিভিন্ন উচ্চতার টার্ন টেবল লেডারসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন রাখা হয়েছে।
জরুরি সেবা আরও কার্যকর করতে ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার (ইআরসিসি) পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান ডিজি। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের হটলাইন ১০২ চালু রয়েছে। এছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমেও ফায়ার সার্ভিসের সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, মিরপুর থেকে পূর্বাচলে ট্রেনিং কমপ্লেক্স স্থানান্তর করা হয়েছে। গজারিয়ায় জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বমানের ফায়ার একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি কেমিক্যাল দুর্ঘটনা, ভবনধস, ডুবুরি কার্যক্রম এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। সদস্যদের বিদেশেও প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে।
ডিজি আরও জানান, সেবা সহজীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গত ১ মে থেকে অনলাইনে ই-ফায়ার লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সদস্যসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি করতে বাহিনীর অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে নগরায়ণ, বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা ও রাসায়নিক গুদামের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় নতুন অগ্নিনির্বাপণ যান, উদ্ধার সরঞ্জাম, আধুনিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসকে আরও আধুনিক ও দ্রুত সাড়াদান সক্ষম বাহিনীতে রূপান্তরের কাজ চলছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক (মিডিয়া সেল) মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার পাশাপাশি সদস্যদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নগর অগ্নিনির্বাপণ, রাসায়নিক দুর্ঘটনা, উচ্চ ভবনে উদ্ধার, ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং পানিতে উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত সাড়াদান সক্ষম জরুরি সেবাবাহিনীতে পরিণত করাই এখন সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য। খবর বাসস।