৩৫ বছর পর ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট শেষে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পরদিন ২১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তবে দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভোট হবে সংসদে

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সংসদের প্লেনারি হলে, যেখানে সাধারণত সংসদ সদস্যরা অধিবেশনে বসেন, সেখানেই ভোটগ্রহণ হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের স্থান নির্ধারণ করেছেন।

প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে একটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে। দুই প্রার্থীর মধ্যে যাকে ভোট দেবেন, নির্ধারিত স্থানে তার পক্ষে ভোট দিয়ে স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে জমা দেবেন।

ভোটকেন্দ্রে তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। সংসদ সদস্যদের সুবিধার জন্য পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে, যাতে একসঙ্গে বেশি ভিড় না হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচার

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ভোটগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ভোটগ্রহণ শুরুর প্রথম ২০ মিনিট সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ সময় রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী (সংসদ সদস্য হলে) তার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি দেখানো হবে।

ভোটগ্রহণের শেষ পর্যায়েও সরাসরি সম্প্রচার থাকবে। ভোট শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্স খোলা, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার কার্যক্রমও সরাসরি দেখানো হবে।

একজন এমপি ভোট দিচ্ছেন না

বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় ভোট দিতে পারবেন না।

তবে অন্য সব সংসদ সদস্য উপস্থিত হয়ে ভোট দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন নুরুল ইসলাম মনি।

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটের সুযোগ নেই

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান এখনো সংশোধন করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনও সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না।

তিনি বলেন, সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন। বিরোধী দলের সদস্যরাও তাদের দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন। আর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন।

বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়াকে স্বাগত

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

তিনি বলেন, সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে দেশে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনীত করেছেন। বিরোধী দলও প্রার্থী দিয়েছে।

বিরোধী দলের প্রার্থী জানেন যে নির্বাচনে তার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তারপরও তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন—এটিকে গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন তিনি।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণকে তিনি স্বাগত জানান। নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা আরও বাড়বে।

১৯৯১ সালের পর আর ভোট হয়নি

রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। ওই নির্বাচনে ৩৩০ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৬৪ জন ভোট দিয়েছিলেন।

এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ এলেও একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

ফলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বিধান থাকলেও ৩৫ বছর ধরে বাস্তবে ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়েনি।

কেন এতদিন ভোট হয়নি

এর প্রধান কারণ ছিল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীর বিপরীতে বিরোধী দলগুলোর প্রার্থী না দেওয়া। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি মূলত একটি সাংবিধানিক পদ হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই সাধারণত নির্বাচিত হয়েছেন।

ফলে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেও একাধিক বৈধ প্রার্থী না থাকায় ভোটাভুটির পর্যায়ে যেতে হয়নি। এবার বিরোধী পক্ষের প্রার্থী থাকায় সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে।

তফসিল থেকে ভোট

গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন প্রার্থীরা।

১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন, অলি আহমদের দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে একটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। মির্জা ফখরুলের একটি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।

১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু দুই প্রার্থীর কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের পথ নিশ্চিত হয়।

ভোট দেবেন ৩৪৯ এমপি

আগামীকাল দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।

সংসদে সাধারণ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ২১১ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন, অন্যান্য দলের ৭ জন ও স্বতন্ত্র ৭ জন রয়েছেন। সংরক্ষিত আসনে বিএনপি ও সমমনাদের ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১৩ জন এবং স্বতন্ত্র একজন সদস্য রয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণ সরাসরি ভোট দেন না; সংসদ সদস্যরাই নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে ভোট দেন। ফলে এবারের নির্বাচনে জাতীয় সংসদের বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির চিত্রও প্রতিফলিত হবে।

জয় নিশ্চিত, নজর ভোটের ব্যবধানে

সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির সংসদ সদস্যরা তার পক্ষেই ভোট দেবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদকে সমর্থন করছেন জোটের সংসদ সদস্যরা।

ফলে নির্বাচনের মূল আকর্ষণ শুধু কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন—এখানে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং দুই প্রার্থী কত ভোট পাচ্ছেন, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২ ভোট পেয়েছিলেন। ৩৫ বছর পর আবারও দুই রাজনৈতিক পক্ষের প্রার্থীর মধ্যে ভোট হওয়ায় সেই নির্বাচনের সঙ্গে এবারের ভোটের ফলাফলের তুলনাও সামনে আসতে পারে।

৩৫ বছর পর নতুন রাজনৈতিক বার্তা

দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার বিরোধী পক্ষের প্রার্থী থাকায় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ পেয়েছে।

ফলে ২০ আগস্টের ভোট শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ১৯৯১ সালের পর ৩৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাভুটির প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার ঘটনাও।

কে কত ভোট পেলেন, সেই ফলাফলই শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার কথা বলছেন চিফ হুইপ

সরকার ও বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংসদকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, এককভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষকে নিয়েই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হয়।

রেললাইনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি লাইন দিয়ে রেল চলতে পারে না, দুটি লাইন লাগে। একইভাবে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষের অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্রও কার্যকরভাবে চলতে পারে না।

তিনি বলেন, অতীতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও দূরত্ব ছিল। কিন্তু এখন সংসদে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। অধিবেশন শেষে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের একসঙ্গে বসে আলোচনা করতেও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন বলে মনে করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে দেশে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় নিশ্চিত জেনেও বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। এটিকে গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বিরোধী দলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।

চিফ হুইপের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।

ভোটে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

দীর্ঘ সময় ভোট না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ভোটের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন সেই আগ্রহ আবার ফিরে এসেছে।

চিফ হুইপ বলেন, গত দুই অধিবেশনের কার্যক্রম দেখে তিনি মনে করছেন, মানুষের সংসদের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্যরা কে কী বলছেন, সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে কী বক্তব্য দিচ্ছেন—মানুষ তা জানতে আগ্রহী।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদে প্রায় ২৬০ জন সদস্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের শেখার আগ্রহ রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যেও সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার তীব্র আগ্রহ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও ডেপুটি স্পিকারও প্রথমবারের মতো এই দায়িত্বে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যেভাবে হয়

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও একজনের সমর্থন থাকতে হয়।

এই নির্বাচনের ভোটার সংসদ সদস্যরা। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে নির্ধারিত দিনে জাতীয় সংসদ ভবনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হয়। ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হয়।

সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচনি কর্তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।

একই অনুচ্ছেদের (৪) দফা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়সী হন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন অথবা সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতার যোগ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। বয়সের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩৫ বছর হতে হবে।

২১ আগস্ট শপথ

চিফ হুইপ জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ২১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে।

শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি প্রতিনিধি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানান তিনি।

তৃতীয় অধিবেশনেই নতুন রাষ্ট্রপতির প্রথম ভাষণ?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী ২৭ আগস্ট থেকে শুরু হবে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। এর আগে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় তৃতীয় অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতির সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিতে পারেন এবং সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে তার প্রথম সংসদীয় ভাষণকে ঘিরে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির ভাষণ কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

অধিবেশনের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি সংসদ ভবনে এসে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সংসদে ভাষণ দেবেন—এমন রেওয়াজ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণে সাধারণত সরকারের নীতি, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

ভাষণ শেষে রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদে একটি প্রস্তাব আনা এবং তা নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনা করারও সংসদীয় রেওয়াজ রয়েছে। তবে সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদের ‘সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনের শুরুতে’ ভাষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চলমান সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিষয়টি কীভাবে হবে, তা অধিবেশন শুরু হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পরাজয় জেনেও কেন অংশ নিচ্ছে জামায়াত?

সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই নিশ্চিত হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জয়-পরাজয় নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ফিরিয়ে আনাই তাদের লক্ষ্য।

তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হয়। ফলে জয়ের সম্ভাবনা কম থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকাকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখছে জোটটি।