রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদে কীভাবে হয় 

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট শেষে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পরদিন ২১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। 

রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। 

ভোট হবে সংসদে 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে সংসদের প্লেনারি হলে, যেখানে সাধারণত সংসদ সদস্যরা অধিবেশনে বসেন, সেখানেই ভোটগ্রহণ হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের স্থান নির্ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। 

প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে একটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে। দুই প্রার্থীর মধ্যে যাকে ভোট দেবেন, নির্ধারিত স্থানে তার পক্ষে ভোট দিয়ে স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে জমা দেবেন। 

ভোটকেন্দ্রে তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। সংসদ সদস্যদের সুবিধার জন্য পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে, যাতে একসঙ্গে বেশি ভিড় না হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। 

ভোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচার 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ভোটগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। 

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ভোটগ্রহণ শুরুর প্রথম ২০ মিনিট সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ সময় রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী (সংসদ সদস্য হলে) তার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি দেখানো হবে। 

ভোটগ্রহণের শেষ পর্যায়েও সরাসরি সম্প্রচার থাকবে। ভোট শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্স খোলা, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার কার্যক্রমও সরাসরি দেখানো হবে। 

একজন এমপি ভোট দিচ্ছেন না 

বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় ভোট দিতে পারবেন না। 

তবে অন্য সব সংসদ সদস্য উপস্থিত হয়ে ভোট দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন নুরুল ইসলাম মনি। 

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটের সুযোগ নেই 

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ জানান, সংবিধান এখনও সংশোধন করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনও সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না। 

তিনি বলেন, “সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন। বিরোধী দলের সদস্যরাও তাদের দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন। আর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেবেন।” 

ভোট দিতে পারবেন না কর্নেল অলি আহমেদ 

ইসি ৩৪৯ জনের ভোটার তালিকা তৈরি করেছে। এই তালিকায় বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও রয়েছে। তিনি নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়ায় নিজের ভোট নিজেই দিতে পারবেন। তবে এই সুযোগ পাচ্ছেন না জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমেদ। সংসদ সদস্য না হওয়ায় তিনি নিজেকে ভোট দিতে পারবেন না। 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৯ জনের ভোটার তালিকা করা হয়েছে। সেখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও রয়েছে। তিনি নিজেকে ভোট দিতে পারবেন কিনা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য হওয়ায় তিনি ভোট দিতে পারবেন। তবে অলি আহমেদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তিনি ভোট দিতে পারবেন না। তিনি ভোটার নন, ফলে ভোট দেওয়ার সুযোগও নেই। তিনি সংসদ সদস্য হলে ভোট দিতে পারতেন। একইভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও যদি সংসদ সদস্য না হতেন, তাহলে তিনিও ভোট দিতে পারতেন না।” 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার কারা

সংসদ সদস্যদের ভোটের মধ্য দিয়েই মূলত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সেই হিসেবে সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। আইন অনুযায়ী, তাদের নাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনায় একজন নির্বাচিত প্রার্থীর অযোগ্য হওয়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে কোনও ভোটার নেই। 

সংসদে সাধারণ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ২১১ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন, অন্যান্য দলের ৭ জন ও স্বতন্ত্র সাতজন রয়েছেন। আর সংরক্ষিত আসনে বিএনপি ও সমমনা দলের ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১৩ জন ও স্বতন্ত্র একজন সদস্য রয়েছেন। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বিএনপি ও সমমনাদের। 

উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন প্রার্থীরা। ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে কমিশন। একই দিন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমেদের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করে কমিশন।