গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের শাস্তি, ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা গুমের পাঁচ বছর পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা অন্যূন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ফলে আগামী সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনসহ বিলটি সংসদে উঠতে পারে।
বিলটি নিয়ে বিরোধী দল আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “কোনও নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে তাদের কোনও আপত্তি আছে কিনা, তা আমি জানি না। তবে বিলটি একই দিনে পাস হবে না। বিরোধী দল বিলটি পর্যালোচনার যথেষ্ট সময় পাবে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠের সময় তারা মতামত ও পরামর্শ দিতে পারবে।”
বিলটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি সরাসরি জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে আদেশদাতা, সহায়তাকারী, প্ররোচনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী এবং অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গুমের সংজ্ঞা
প্রস্তাবিত আইনে কোনও সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য নিজের পরিচয়ে অথবা কোনও সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, সমর্থন বা সম্মতিতে কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্যভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করলে কিংবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন রাখলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হবে।
তবে ব্যাপক বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে সংঘটিত গুম এই আইনে বিচার্য হবে না; তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হবে।
কমপক্ষে তিন বছর কারাদণ্ড
বিলের ৫ ধারায় গুমের জন্য অন্যূন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের কারণে ভুক্তভোগীর মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার অথবা পাঁচ বছর পরও জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা অন্যূন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে।
গুমের প্রমাণ ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট, গোপন, বিকৃত বা পরিবর্তন করলে অন্যূন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহার করলেও অন্যূন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও দায়
কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতা অধস্তনদের গুমের নির্দেশ, অনুমতি, সম্মতি বা প্ররোচনা দিলে কিংবা নিজে এতে অংশ নিলে মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি পাবেন।
অপরাধের পরিকল্পনা বা কার্যক্রম সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নেওয়া, অধস্তনদের নিয়ন্ত্রণ বা তদারকিতে ব্যর্থ হওয়াকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাহিনীর বাইরের কোনও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
গুম হবে ‘চলমান অপরাধ’
বিলে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি প্রকাশ না করা পর্যন্ত অপরাধ চলমান থাকবে।
এমনকি গুম হওয়া ব্যক্তি মৃত বলে নিশ্চিত হওয়ার পরও তার মরদেহ বা দেহাবশেষ শনাক্ত করে আইনানুগ উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত অপরাধের সমাপ্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেখিয়ে দায় এড়ানো যাবে না
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি কিংবা সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ গুমের অপরাধের অজুহাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
থানায় অভিযোগ, পুলিশ না নিলে ম্যাজিস্ট্রেটে মামলা
গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী অথবা সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করতে পারবেন। পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলে সরাসরি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করা যাবে।
কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনী বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে অভিযুক্ত বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। সরকার অন্য কোনও বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।
তদন্তের জন্য ৯০ দিন সময় থাকবে। যুক্তিসঙ্গত কারণে ম্যাজিস্ট্রেট আরও ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারবেন।
গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজতে তল্লাশি
গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালত আটককেন্দ্র, স্থান বা স্থাপনায় তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। পুলিশ, শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য বা উপযুক্ত অন্য ব্যক্তি তা কার্যকর করতে পারবেন।
পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার
গ্রেফতার বা বিচারের জন্য আদালতে হাজির হওয়া এড়াতে আসামি পলাতক বা আত্মগোপনে থাকলে আদালত তাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে। তথ্যপ্রযুক্তি, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি, বিদেশি দূতাবাস বা ইন্টারপোলের মাধ্যমে নোটিশ দেওয়া যাবে।
নির্ধারিত সময়ে হাজির না হলে আদালত তার অনুপস্থিতিতে বিচার করতে পারবে।
৯০ কার্যদিবসে বিচার শেষ
গুমের অপরাধের বিচার কেবল এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালতে হবে। অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। সম্ভব না হলে কারণ লিপিবদ্ধ করে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নেওয়া যাবে এবং বিলম্বের কারণ সুপ্রিম কোর্টে জানাতে হবে।
দেশের বাইরেও বিচার হতে পারে
বাংলাদেশের ভূখণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের দূতাবাস, নিবন্ধিত জাহাজ, বিমান বা অন্য যানে গুমের ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ার থাকবে।
অভিযুক্ত বা গুম হওয়া ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলেও বিচার করা যাবে। অভিযুক্ত বিদেশি নাগরিক হলেও তিনি বাংলাদেশের এখতিয়ারাধীন এলাকায় অবস্থান করলে বিচার চলতে পারবে।
মিথ্যা মামলা করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড
গুমের অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হলে আদালত অভিযোগকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে এবং অনধিক পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারবে।
দায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় করা অর্থদণ্ড ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে। তার সম্পত্তি থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেবে।
মামলা জামিনঅযোগ্য ও আপসঅযোগ্য
বিল অনুযায়ী গুমের অপরাধ হবে আমলযোগ্য, জামিনঅযোগ্য ও আপসঅযোগ্য। জামিন দেওয়ার আগে অভিযোগকারী পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে।
তবে নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে অসুস্থ আসামির ক্ষেত্রে এবং জামিনে বিচার বাধাগ্রস্ত হবে না বলে আদালত সন্তুষ্ট হলে জামিন দেওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল যোগাযোগও সাক্ষ্য
অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির কথোপকথন, যোগাযোগ, ছবি, ভিডিওসহ অপরাধসংশ্লিষ্ট তথ্য সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। তবে তা সাক্ষ্য আইনের বিধান অনুযায়ী হতে হবে।
তথ্যদাতা ও সাক্ষীর সুরক্ষা
গুমের ঘটনা সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ প্রকাশকারী ব্যক্তি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা আইনের অধীনে সুরক্ষা পাবেন।
আদালত অভিযোগকারী, ভুক্তভোগী, সাক্ষী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশকারীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদেশ দিতে পারবে।
ভুক্তভোগীর তথ্য জানার অধিকার
গুমের ভুক্তভোগীরা ঘটনার বিস্তারিত, তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। তারা সংগঠন গঠন ও সরকারি আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হবেন।
গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, গোপন আটক থেকে মুক্ত করা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেহাবশেষ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
পাঁচ বছর পর সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ
গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ, দায় পরিশোধ বা যৌক্তিক ব্যয়ের জন্য আদালত তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে।
কোনও ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর গুম থাকার পরও ফিরে না এলে বৈধ উত্তরাধিকারীর আবেদনে আদালত সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের ঘোষণা এবং ‘গুম সনদ’ দিতে পারবে।
ক্ষতিপূরণ ও তথ্যভান্ডার
গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তার জন্য সরকার তহবিল গঠন করতে পারবে।
এছাড়া গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়, নিখোঁজ হওয়ার সময় ও স্থান, পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, তদন্ত ও আদালতের আদেশ, আপিল এবং ক্ষতিপূরণের তথ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যাপক বা পরিকল্পিত গুম যাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
ব্যাপক বা পরিকল্পিত গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। একই ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে মামলা চললে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ঘটনায় এই আইনে আর কার্যক্রম চালানো যাবে না।
তদন্ত বা বিচার চলাকালে কোনও অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য মনে হলে তা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।
কেন নতুন আইন
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই আইন করা হচ্ছে। এতে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিনঅযোগ্য ও আপসঅযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দায়ীদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আইনি কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনসহ বিলটি সংসদে এলে এর ওপর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।