সরকারবিরোধী বা মন্ত্রীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়া এবং সাইবার হামলার অভিযোগ তুলে সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ‘গলা চিপে ধরছে’ কি না— জানতে চেয়েছেন নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্নে তিনি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর কাছে এ ব্যাখ্যা চান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
হান্নান মাসউদ বলেন, ‘সংসদে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, তিনি নির্বাচিত নন এবং ভোটিংয়ে অংশ নেবেন না। বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর ওই সংবাদ সরিয়ে ফেলা হয়। একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলেকে নিয়ে ‘ডেইলি ওয়াদা’ সংবাদ প্রকাশ করলে সেই সংবাদও সরিয়ে নিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চ্যানেল ওয়ান-এ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমকে নিয়ে একটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই চ্যানেলের প্রতিবেদনে সাইবার হামলা হয়। ফলে অনেকদিন প্রতিবেদনটি পাওয়া যায়নি।’
হান্নান মাসউদ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বা সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কোনও নিউজ করলে এই যে সাইবার অ্যাটাক এবং প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার নিউজগুলো আমরা দেখতে পাই, এতে করে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে— সরকার কি মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা চিপে ধরছে?’
এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর ব্যাখ্যা জানতে চান তিনি।
জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থের পক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় বর্তমানে গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।’
তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেবের নির্দেশে গণমাধ্যমকে আমরা কোনও রকম কন্ট্রোল করতে চাচ্ছি না, করছিও না।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম স্বাধীন। কোন সংবাদ আপলোড করবে, কোন সংবাদ ডাউনলোড করবে, কোন সংবাদ ছাপবে বা ছাপবে না– এটি তাদের নিজস্ব বিষয়। এ ক্ষেত্রে সরকার কোনও হস্তক্ষেপ করে না।’
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কোনও সংবাদ পরিবেশন করার পরে বুঝতে পারেন যে সংবাদটা সঠিক নয় বা সংবাদটা পরিবেশন করা উচিত নয়, সেই ক্ষেত্রে তারা অবশ্যই খবরটা সরিয়ে নিতে পারেন। সেই বিষয়ে আমরা হস্তক্ষেপ করি না এবং আমরা সংবাদ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি বলেই আমরা হস্তক্ষেপ করবো না।’
সমন্বিত ফ্যাক্টচেকিং কাঠামো গড়ছে সরকার
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্তে সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় সমন্বিত ফ্যাক্টচেকিং কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) একটি সমন্বিত ফ্যাক্টচেকিং ও তথ্য যাচাই কাঠামো গড়ে তুলেছে। তথ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ‘ফ্যাক্টচেকিং ও গুজব প্রতিরোধ কমিটি’ সার্বক্ষণিকভাবে কার্যরত রয়েছে।
মিটির দিকনির্দেশনায় প্রধান কার্যালয়সহ বিভাগীয় শহরের আঞ্চলিক তথ্য অফিসগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মনিটর করে। অপতথ্য ও গুজব শনাক্তের পর সরকারি ‘ফ্যাক্টচেক’ বার্তা ও স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি তথ্য অধিদফতর ও আঞ্চলিক তথ্য অফিসগুলোর ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।
লিখিত জবাবে আরও জানানো হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য রোধে ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া অ্যানালাইসিস কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পিআইবির ফ্যাক্টচেকিং ইউনিট ‘বাংলাফ্যাক্ট’ এ পর্যন্ত ৮৬০টি ফ্যাক্টচেক, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ভিডিও বা রিল প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকাশ করা হয়েছে ৩০৬টি।
এছাড়া পিআইবির প্রশিক্ষণ বিভাগ ১ অক্টোবর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় ১৪১টি প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে ৬ হাজার ৭৭৪ জন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০টি প্রশিক্ষণে ৭৩৯ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল সাংবাদিকতা, এআই ও ফ্যাক্টচেক বিষয়ে ১৪টি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত দুই বছরে পিআইবি আয়োজিত প্রতিটি প্রশিক্ষণে অন্তত একদিন গুজব মোকাবিলায় করণীয়, ফ্যাক্টচেকিং এবং সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
লিখিত জবাবে আরও বলা হয়, বাংলাফ্যাক্ট ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি ও নাম ব্যবহার করে পরিচালিত ১৩৭টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ শনাক্ত করেছে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের অনুকরণে প্রচারণা ও অপতথ্য ছড়ায় এমন ১৬টি ওয়েবসাইটও চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ায় এমন ৩০০টির বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং ১০০টি এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাফ্যাক্ট প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫টি দাবির সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন, রিল ও ভিডিও প্রকাশ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।