দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর উর রশিদ বলেছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র সারের সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত বছর একই সময়ে সরকারের গুদামে ১২ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত ছিল। বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন। ফলে দেশে সার নেই—এমন বক্তব্য সঠিক নয়।
তিনি বলেন, ‘ওনার বক্তব্য একটা জিনিস ক্লিয়ার করে গিয়েছে—একটা সংঘবদ্ধ দল এ ধরনের কিছু করার চেষ্টা করছে।’
কৃষিমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকায় গত অর্থবছরের আগস্টে সারের বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৫৯০ টন। চলতি অর্থবছরের একই মাসে বরাদ্দ হয়েছে ১ হাজার ৮৪৭ টন। বরাদ্দে এত পার্থক্য কেন এবং কোথায় সার যাচ্ছে, সে বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন নীতিমালায় ডিলার নিয়োগ
কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সার বিতরণব্যবস্থা কৃষকবান্ধব করতে সরকার ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে।
নতুন নীতিমালায় প্রতি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তিনজন ডিলার রাখার বিধান করা হয়েছে। বর্তমানে বিসিআইসি ও বিএডিসির দুজন মাস্টার ডিলারের মাধ্যমে সার সরবরাহের পাশাপাশি ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন সংখ্যক ডিলার রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ইউনিয়নে আরও একজন মাস্টার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিভিন্ন অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত ডিলারদের তালিকা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধভাবে সার মজুতের ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার, জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের ডিলারশিপ থাকবে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
তিন স্তরে মনিটরিং
সারের সরবরাহ, উত্তোলন, গুদামজাতকরণ, বিক্রয়মূল্য, ডিলার বাছাই ও কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং সার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উপজেলা ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটি কাজ করছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিশেষ টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের একটি কমিটি জেলাভিত্তিক দায়িত্ব নিয়ে সার ব্যবস্থাপনা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।
তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যের, জেলা পর্যায়ে ১৩ সদস্যের এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব।
নতুন কমিটিগুলোতে কৃষক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সময়
নতুন নীতিমালার আলোকে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। আবেদনের সময়সীমা ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকলেও তা বাড়িয়ে ১০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলা পর্যায় হয়ে কেন্দ্রে আসবে। নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে তিনজনকে বাছাই করে পাঠানো হবে। সেখান থেকে একজনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সার উত্তোলন ও বিতরণ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করার আহ্বান জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডিলারদের রসিদ দিয়ে সার বিক্রি করতে হয়। সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে ‘চোখ-কান খোলা’ রাখলে দুষ্কৃতিকারীরা দ্রুত এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে।