সংসদে জামায়াত আমির

গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, মিথ্যা আশ্বাসে সংকট আড়াল করা যাবে না

বিদ্যুতের প্রকৃত ঘাটতি আড়াল না করে তা জনগণের সামনে খোলাখুলি তুলে ধরার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গ্রামে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, হাস্যকর অজুহাত বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তীব্র সংকট আড়াল করা জাতির সঙ্গে প্রহসন। একইসঙ্গে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিলম্ব না করে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নোটিশটি উত্থাপন করা হয়।

অধিবেশনের এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এর আগে বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

মিটার ও ডিমান্ড চার্জ এখনও আদায় হচ্ছে

বিদ্যুতের মিটার ও ডিমান্ড চার্জ বাতিলের কথা সংসদে বলা হলেও তা এখনও নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিগত সরকার ঘনিষ্ঠদের লালন-পালন করতে সুযোগ দিয়েছিল। সেই দুষ্টচক্র থেকে জাতিকে যেভাবেই হোক বের করে আনতে হবে। বড় নীতি নির্ধারকদের নিজেদের তৈরি নীতি ভাঙার প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।

শুধু অতীতের সরকারকে দোষারোপ করে সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বড় বড় মহাপরিকল্পনা ও প্রকল্প কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং পরিণতিতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

ক্যাপাসিটি চার্জ জনগণের টাকা চুরির নামান্তর

বিদ্যুৎ খাতের বহুল আলোচিত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সাধারণত কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে তিন বছরের জন্য চুক্তি করা হয়েছিল, যাতে তাদের প্রারম্ভিক ব্যয় উঠে আসে। কিন্তু মেয়াদ পার হওয়ার পরও বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে যাওয়া জনগণের টাকা চুরির নামান্তর।

অতীতের ভুলগুলো শুধরে না নিলে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে এবং একের পর এক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, সরকার কিংবা সরকারি দল পরিবর্তন হলেও জনগণের ট্যাক্সের টাকা চুরির অপসংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই সংকট থেকে জাতির মুক্তি নেই।

ক্ষমতার ফাঁক দিয়ে আসামিরা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে

জাতীয় সংসদে দায়িত্বশীলদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার অমিলের বিষয়টিও তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারে সরকারের যে ক্ষমতার কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবে ব্যর্থ প্রমাণ হয়েছে। ক্ষমতার ফাঁক দিয়ে আসামিরা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ভূতুড়ে বিল সমাধানের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সেটিও এখনও বহাল রয়েছে।

সরকারের মধ্যে নীতি ও নৈতিকতার প্রকাশ ঘটাতে নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের স্বার্থের বাইরে এসে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে সাদামাটা জীবনযাপন করছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে তার চারপাশের সুযোগসন্ধানীরা কেবল মুখের কথায় তা অনুসরণ করেন, বাস্তবে নয়। নেতানেত্রীদের কেবল তোষামোদ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং জাতির সামগ্রিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি লুকানোর যেকোনও চেষ্টা জাতির সঙ্গে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সমস্যা লুকানোর পরিবর্তে বিদ্যমান ঘাটতির প্রকৃত তথ্য সরকারের উচিত জনগণের সামনে খোলাখুলি তুলে ধরা। গ্রামগুলোতে এখনও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে।

সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত সময়সূচি জাতিকে দিলে মানুষ মানসিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

‘মিথ্যা আশ্বাস কিংবা হাস্যকর অজুহাত দিয়ে বর্তমান তীব্র সংকট আড়াল করা সম্ভব নয়’—বলেন শফিকুর রহমান।

ক্রেডিটের কোনও ক্ষুধা নেই

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তা এবং একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী স্পেশাল টাস্কফোর্স বা বিশেষ সেল গঠন করা প্রয়োজন। সেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দলের পাশাপাশি টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একসঙ্গে রূপরেখা তৈরি করতে হবে।

 ‘ক্রেডিটের কোনও ক্ষুধা নেই’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব কৃতিত্ব সরকার নিলেও বিরোধী দলের কোনও আপত্তি নেই। বিরোধী দল চায় কার্যকর ফলাফল এবং দেশের উন্নতি।

বিদ্যুৎ সংকট কোনও একক দলের সমস্যা নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎহীন দেশ ক্রমান্বয়ে শক্তিহীন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি প্রতিরোধে কার্যকর জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য।

ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবি চিরস্থায়ী নয়

ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পদ-পদবির নশ্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতা কিংবা বিরোধী দল হিসেবে সংসদে অবস্থান—কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

ইতিপূর্বে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা বড় দলগুলো আজ সংসদে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান দায়িত্বশীলদের এ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

দেশের জন্য বর্তমানে নেওয়া সব শুভ সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে রঙিন ও গৌরবময় ইতিহাস তৈরি করবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার জনস্বার্থে যে কঠোর পদক্ষেপগুলো বিলম্ব না করে কার্যকরভাবে গ্রহণ করছে, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধেও একইভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।

জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ভুলে স্বচ্ছতা, নীতি ও প্রাগম্যাটিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন বিরোধীদলীয় নেতা।