সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগের ঘটনায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল নিয়ে জনমনে কী বার্তা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ আহ্বান জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, গতকাল (৮ সেপ্টেম্বর) দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বাদানুবাদ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন এবং সেদিন আর আদালতে ফেরেননি।
তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। একজন আইনজীবী তথ্য গোপন করে রিট করায় তাকে জরিমানা করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ঘটনার সূত্রপাত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, ‘মাহবুব উদ্দিন খোকন শুধু একজন আইনজীবী নন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সংসদ সদস্য। একইসঙ্গে তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হলো বিচার বিভাগ। সেখানে এ ধরনের ঘটনা জনগণের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
অতীতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে প্রধান বিচারপতিকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো দুঃখজনক ঘটনাও দেশ দেখেছে। অতীতের সেই অভিজ্ঞতার কারণে এ ধরনের ঘটনা নতুন করে কোনো আশঙ্কার বার্তা দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ; কারওই এককভাবে সার্বভৌমত্ব নেই। জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। জনগণের দেওয়া ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। একটি অঙ্গের ওপর আরেকটি অঙ্গের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা উচিত নয়।’
এ সময় বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি করেন তিনি, যাতে জনগণ এ বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারে।
বার-বেঞ্চের সম্পর্কের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “সংসদ সদস্য যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। তবে এ ঘটনাকে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ বা ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’-এর বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।”
তিনি বলেন, ‘যে আইনজীবীর আচরণ নিয়ে ঘটনা ঘটেছে, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বার অ্যাসোসিয়েশন রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের কোনও অঙ্গের অংশ নয়; এটি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীদের একটি সংগঠন। তাই ওই আইনজীবীর আচরণকে কোনো রাষ্ট্রীয় অঙ্গের আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি না করেন, সেটিই প্রত্যাশা।’
বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে বা আইনজীবী ও বেঞ্চের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেও অনেক সময় আদালতের বাইরে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে।’ অতীতের একটি আদালতকেন্দ্রিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।
আইনমন্ত্রী জানান, ‘আগের দিনের ঘটনার পর প্রধান বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করলেও পরদিন সকাল ৯টায় তিনি যথারীতি আদালতের কার্যক্রম শুরু করেছেন।’
এমনকি ওই আইনজীবীও প্রধান বিচারপতির আদালতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে মামলায় অংশ নিয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যকে বিষয়টি সংসদের সামনে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।’
তিন অঙ্গের কেউ অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য ও স্বাধীনতা বজায় রাখা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের স্বাধীনতাও সমানভাবে রক্ষা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের দেওয়া ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হতে হবে। কোনও অঙ্গ যেন অন্য অঙ্গের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা না করে—এটাই সাংবিধানিক ব্যবস্থার মূল চেতনা।