ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে আইনের ১৮ক ধারা বিলুপ্ত করা হলো। ধারাটি বিলুপ্ত হওয়ায় একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকদের ফিরে আসার আইনি পথ বন্ধ হলো।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইন সংশোধনের বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এ সময় সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
আইনের ১৮ক ধারায় একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকদের সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা ছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন এই আইনের অধ্যাদেশ জারি করে, তখন সেখানে এই ধারাটি ছিল না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ধারা যুক্ত করা হয়। এরপর ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিশ্লেষকরা বলেন, ১৮ক ধারার মাধ্যমে ব্যাংক লুটপাটকারীদের জন্য কিস্তিতে মালিকানা কেনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
সংসদে উত্থাপিত বিলে ১৮ক ধারা বাতিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রচলিত রেজল্যুশন টুলগুলোর পাশাপাশি একটি বাজারভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা প্রচলন, রেজল্যুশনের আওতাধীন ব্যাংককে সচল রেখে এর পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট দূরীকরণ, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, সরকারি আর্থিক সংশ্লেষ হ্রাসকরণ এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮৮ নং আইন)’ এ ১৮ক ধারাটি সংযোজন করা হয়।
তিনি বলেন, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ওই ধারার পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে ইতোমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা সমীচীন এবং এর প্রয়োজনীয়তা প্রাসঙ্গিক।
এরপর অর্থমন্ত্রী সংশোধিত আইনটি পাস করার প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে এই আইন সংশোধনের বিলের ওপর আলোচনার সময় একজন সংসদ সদস্যের মন্তব্যকে ঘিরে সংসদে তীব্র হট্টগোল সৃষ্টি হয়। বাদানুবাদের শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তার একটি নির্দিষ্ট চরিত্র প্রকাশ পায়, যা অতীতেও দেখা গেছে। এবার বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের রেকর্ড হচ্ছে।
এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হইতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর সারের সংকট হবে না, সারে যারা গরীব কৃষক আছেন তারা সার কারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না, সেটাও হইতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মত ঋণ খেলাফিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেইটাও হইতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণ খেলাফিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লক্ষ কোটি টাকার উপরে ঋণ খেলাপি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।’
এ সময় সরকারি দলের সদস্যরা যার যার আসনে বসে চিৎকার করতে থাকেন। সংসদে সৃষ্ট হট্টগোলের প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এত অসহিষ্ণু সংসদ! মনে হয় যেন একেবারে আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা মন্দ না! আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন এরাও একই ধরনের আচরণ করছে; আরও খারাপ আচরণ বরং।’ এরপর ব্যাংক রেজল্যুশন বিলের একটি ধারা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘যাই হোক, এই আইনটিতে ১৮-র “ক” ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছিল ১৮-র “ক” রাখা হবে না, কিন্তু আছে।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এর কারণ হচ্ছে, এই সংসদে বেশিরভাগ সংসদ সদস্য ঋণ খেলাফী হিসেবে পরিচিত। ওই নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা, এগুলো আমাদের পুরানো সংস্কৃতি, এগুলো আমরা বহুত...’
তিনি আরও বলেন, ‘ইলেকশনের আগে তাড়াতাড়ি ঋণ খেলাপি থেকে নাম বাদ দেয়, আর ইলেকশনটা যেই শেষ হয়...।’ তবে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাব দেননি কেউ।
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় সংসদে যেকোনও সংসদ সদস্যের কথা শোনার দায়িত্ব এবং তার বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত বা অসংসদীয় বক্তব্য এলে স্পিকারের আসন থেকে রুলিং আসতে পারে কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জবাব দিতে পারেন। কিন্তু বক্তব্য পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া বা থামিয়ে দেওয়া সংসদীয় রীতির পরিপন্থী।
সংসদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে স্পিকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও প্রতিকার দাবি জানান তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য তিনি দাঁড়িয়েছেন তার কথা বলতে। আপনার জায়গা থেকে আপনি তাকে সুযোগ দিয়েছেন। হতে পারে তার কথাগুলো সবগুলা সঙ্গত নয়, আবার হতে পারে যে কথাগুলো তার গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কিছুই শুনতে পারলাম না, কী উনি বললেন, সব তো হারায়ে গেল।’
তিনি বলেন, ‘এখন তার কথাগুলো শোনার যেমন দায়িত্ব আমাদের আছে, বলারও অধিকার তার আছে। হ্যাঁ, তিনি যদি আনপার্লামেন্টারি কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা আপনার জায়গা থেকে রুলিং আসতে পারে। আবার এ সমস্ত কথার জবাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যখন দাঁড়াবেন, তিনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, তিনি দিতেই পারেন।’
তিনি সংসদে জানান, গতদিনও এ রকম একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তখন কিন্তু এই চেয়ার বড় কঠিন চেয়ার ছিল আমাদের জন্যে। আজকে উনি কী বললেন, আমরা তো একেবারেই বুঝতে পারলাম না। উনি কী গালি দিলেন না দোয়া দিলেন, কিছুই বুঝলাম না।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন আসলেই কি তিনি বক্তব্য রাখতে পারলেন? তার যে সংসদ সদস্য হিসেবে যে অধিকার ছিল, সেটা কি এস্টাবলিশ হয়েছে? এটা মূলত আমি আপনার কাছেই জানতে চাচ্ছি এবং এর প্রতিকারটা কী হবে? রেকর্ড হবে কীভাবে? আমরাই তো শুনি নাই, আমাদের রেকর্ডই তো হয় নাই। এজন্য এ বিষয়টা স্পষ্ট করা জরুরি বলে আমি মনে করি।’
এ পর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ব্যাংক রেজল্যুশন আইন থেকে ১৮ক ধারা বাদ দেওয়ায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই ধারাটি বাদ দেওয়ার দাবি ছিল বিরোধী দলের। এই ধারা বাদ দেওয়ার মাধ্যমে এস আলমদের ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ বন্ধ হলো।
এরপর সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সবাইকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘আপনার দায়িত্ব সব সদস্যের ওপর। কোনো সদস্যকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে হুইপিং করতে হবে। সংসদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।’
সবশেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন। তিনি আলোচনা প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি।
হট্টগোল প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কী থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না। আমি ভেবেছিলাম কিছু বিষয়ে জবাব দেবো, সেজন্য নোট নিচ্ছিলাম। কিন্তু সেটাও ঠিকভাবে নিতে পারিনি।’