স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত আসলে কার?

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘সরকার কিছুই জানে না, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইসির কোনও চিঠি, কিংবা অন্য কোনোভাবে যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি। অথচ ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকেও ইসিকে চিঠি দিয়ে আট বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য পাঠানো হয়েছে। এরপর ইসি সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে। ‘সরকার কিছুই জানে না’- প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নির্বাচনের তারিখ ‘প্রাথমিক’ বলে জানিয়েছে ইসি।

গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুই দিনের বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ধাপ ও তারিখ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। সেদিন সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন হবে বলে জানান তিনি। যার প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর শুরু হবে বলে উল্লেখ করেন এই নির্বাচন কমিশনার। সাত ধাপে ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

ওইদিন ব্রিফিংয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘‘মোট ইউনিয়ন ৪৫৮০টি। ৭ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপ চলতি বছরের ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া কথা জানানো হয়। এরপর চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি। পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু ইসির এই ঘোষণার পরদিন অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে চিঠি কিংবা অন্য কোনোভাবে যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি।

মীর শাহে আলম বলেন, ‘‘আপনাদের মতো আমরাও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং টেলিভিশনগুলোতে দেখেছি যে নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ধাপ ও তারিখ ঘোষণা করেছে। তবে আমি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চাই, এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না। এবং সরকারের সঙ্গে কোনও পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনও মাধ্যমেও আলোচনা হয়নি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে নির্বাচন করার। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, এ ধরনের সভা করার পরেই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে।’’ আমি আবারও রিপিট করছি—নির্বাচন কমিশন যে তারিখগুলো ঘোষণা করেছে, এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। এই ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না।’’

তবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই দাবি করলেও ইসি সূত্রে জানা যায়, গত ৯ জুলাই ইসির উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে ‘ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্যাদি প্রেরণ’ শীর্ষক একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৯(৩) অনুসারে পরিষদ গঠনের জন্য কোনও সাধারণ নির্বাচন ওই পরিষদের জন্য অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের শপথ গ্রহণ ও প্রথম সভার তথ্য প্রয়োজন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সীমানা/ওয়ার্ড বিন্যাস দ্রুত সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য চিঠিতে নির্দিষ্ট ছক আকারে তথ্য দিতে বলা হয়েছিল।

ইসির এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখার উপ-সচিব জিয়াউর রহমান ইসির সিনিয়র সচিবের কাছে ‘ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্য প্রেরণ’ শিরোনামের একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে আটটি বিভাগের ইউপির তথ্য তালিকা আকারে দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রেরিত ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্যাদি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে প্রেরণ করা হলো।

ঘোষিত তারিখ চূড়ান্ত নয়

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগের দিন ঘোষণা করা ইউপি নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত নয়। একইসঙ্গে ঘোষিত তারিখকে ‘প্রাথমিক’ সিদ্ধান্ত বলেও উল্লেখ করে ইসি। ইসির পক্ষ থেকে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বৈঠকের পর তারিখ চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

মীর শাহে আলমের বক্তব্যের পর সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন ভবনে নিজ দফতরের সামনে বলেন, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে এটা তো ঠিক। কবে হবে এটা নিয়ে কথা। কোনটা কোন পদ্ধতিতে হবে বা কোন স্তরে হবে— এই জিনিসগুলো নিয়ে গত দুদিন ধরে কমিশনে কিছু প্রাক-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। প্রাক-পরিস্থিতিমূলক আলোচনা শেষে প্রাথমিক একটা তারিখ ও ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা পুরোপুরি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। আগামী ১৭ তারিখ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যারা স্টেকহোল্ডার আছেন এবং যারা ভোট গ্রহণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের নিয়ে আমরা একটা মিটিং করবো। এই মিটিংয়ে যে ইনপুট আসবে, সেই ইনপুটের ভিত্তিতে কমিশন পরবর্তীকালে তারিখ ফাইনালাইজ করবে।’’

আখতার আহমেদ আরও বলেন, ‘‘এখন প্রশ্ন হতে পারে ১৭ তারিখের মিটিংয়ের পরে আমরা এটা কেন করলাম না। মিটিংয়ের জন্য তো কিছু উপাত্ত দিতে হবে। এই উপাত্তটাই  ১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া হয়েছে। এই উপাত্তের ভিত্তিতে স্টেকহোল্ডাররা ইনপুটগুলো দিতে পারবেন। কমিশন সেটার ভিত্তিতে ফাইনালাইজ করতে পারবে।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা এ বিষয়ে এখন কিছু বলবো না। আমাদের সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা যেটা করেছি, সেটা  সম্ভাব্য হিসেবে বলেছি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার মিটিং হবে। সেই মিটিংয়ের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর যে বিষয়টি পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে কমিশন সভা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।’’

আইনে আসলে কী আছে, জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘‘আইনের বিষয়ে এখন আমরা কোনও মন্তব্য করবো না। আমরা যেটা বলছি, সঠিক করেছি, মন্ত্রী মহোদয় যেটা বলছেন, উনিও সঠিক করেছেন। দুইটাই সঠিক। আমরা এ ব্যাপারে বলবো না যে আমরা যেটা করেছি সেটাই সঠিক, মন্ত্রী মহোদয়েরটা ভুল।’’

ইসি  স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘ইসিতো স্বাধীন সংস্থা, অবশ্যই পারছে। আমরা যখন পার্লামেন্ট ইলেকশন স্বাধীনভাবে করেছি, এটাও ইনশাআল্লাহ স্বাধীনভাবে করবো।’’

কোনও চাপ বোধ করছে কিনা জানতে চাইলে রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘না। ইসি কোনও চাপ বোধ করছে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ সৃষ্টি করার, ইসি সেটা করবে। এগুলো করার ব্যাপারে আমরা সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’’

সরকারের হাতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এই নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ইসি ‘একক কোনও এখতিয়ার নেই’ জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, “এই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইসিকে সরকারের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কবে নাগাদ নির্বাচন করবে।’’

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, “নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে কেবল দুটি নির্বাচনের জন্য সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত— রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচন। অন্যান্য যত স্থানীয় নির্বাচন রয়েছে, সেগুলো নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সঙ্গে কোলাবোরেট করেই করতে হবে।” স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘‘প্রতিমন্ত্রী যেহেতু জানিয়েছেন যে এ বিষয়ে সরকারের কাছে এখনও তথ্য নেই, তাই সরকারের এই বক্তব্যকেই সঠিক ধরে নিতে হবে এবং উনিই জানেন যে সরকারের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি আবারও বলছি, এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সাথে কোলাবোরেট করে করতে হবে।’’

তবে বিষয়টিকে কোনও সরকারের সঙ্গে ইসির সংঘাত হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্টভাবে চারটি দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সীমানা পুনর্বিন্যাস ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন তাদের কাজ। এর বাইরে অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানে বলা আছে, যেরূপভাবে আইন দ্বারা নির্ধারণ করবে, সেভাবে নির্বাচন হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্টভাবে অনুরোধ করে, তারপর কমিশন ব্যবস্থা নেয়। এটাই হলো প্রচলিত পদ্ধতি। এখন সরকার হয়তো তাদের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করেছে, কিন্তু সুস্পষ্টভাবে নির্বাচনের জন্য কমিশনকে অনুরোধ করেনি। এটা বর্তমানে সরকারের অবস্থান। তবে নির্বাচন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনেরই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। 

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন অবশ্যই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের জন্য তারা যে নির্বাচন কন্ডাক্ট করে, যেমন- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সংসদ নির্বাচন—এগুলো টোটালি তাদের হাতে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেটা আছে, এটা তাদের হাতে না, এটা সরকারের হাতে। সরকার ঠিক করবে কবে হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সেপ্টেম্বরে বলছে যে, নভেম্বরে ইলেকশন হবে, নভেম্বরের ১২ তারিখে। সরকার বলছে, তারা কিছু জানে না। কিন্তু সরকারকে তো জানতে হবে। সরকার যদি বলতো, ঠিক আছে, অসুবিধা নাই, নভেম্বরে হবে, তাহলে এখানে সরকারের সদিচ্ছাটা প্রকাশিত হতো। সরকার বলছে, আমরা জানি না, তার মানে তো নভেম্বরে নির্বাচন করতে চায় না, অন্য সময়ে করতে চায়। এখানে সরকারের সদিচ্ছাটা প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু আইনগতভাবে সরকার কোনও অন্যায় করেনি।’’

জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক আরও বলেন, ‘‘ইলেকশন কমিশন ওই আইনটাকে চেঞ্জ করার জন্য একটা খসড়াও করছে। কিন্তু ওই আইনটা যতক্ষণ পর্যন্ত পাস না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আগের আইনই কার্যকর। এক্ষেত্রে সরকারের যে অবস্থান, সেটা  আইনিভাবে  ঠিক। কিন্তু নৈতিকভাবে অথবা কমনসেন্সে আমাদের মনে হয়, এটা হয়তো সরকার এভাবে না করলেও পারতো। সরকার নিজের সুবিধামতো সময়ে এই কাজটা করতে যাচ্ছে।’’

সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘এখানে আরও কিছু ঘটনা আছে। ইলেকশন করতে গেলে বিপুল সংখ্যক স্কুলশিক্ষক লাগে, সরকারি কর্মকর্তা লাগে। নভেম্বর মাসে তো স্কুলের অনেক ফাইনাল পরীক্ষা হয়। হয়তো সেই কারণে সরকার এটা না করছে, আমার ধারণা। সে হিসাবে দেখলে সরকারের হিসাব যে ভুল, তা বলা যাবে না। বরং নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল—তারা তো আইনটা জানে, সরকারের সঙ্গে আলাপ করে তারিখ ঘোষণা করা। আলাপ না করে তারা যেটা করেছে, এটা তারা ঠিক করেনি।’’

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ইসির ইউপি নির্বাচনের ঘোষিত তারিখকে চূড়ান্ত নয় বলে জানানোর কারণে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিনা, এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ শঙ্কা প্রকাশ করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, ‘‘সরকার বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচন বর্জনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের নির্দেশনাতেই এটি পরিচালিত হচ্ছে। তাই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না কমিশন।’’

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মাহাবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশন এখনও স্বাধীন নয়। কারণ এটি আগের কাঠামোতেই আছে। তাই তারা চাইলেও নিজের মতো কাজ করতে পারছে না। আমাদের বারবার দাবি ছিল— জুলাই সনদের আলোকে ইসির গঠনতন্ত্র সংশোধন করার। কিন্তু সরকার নিজেদের সুবিধামতো কমিশনকে ব্যবহার করতেই বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী চালাচ্ছে।’’

অপরদিকে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন বলেই মনে করছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন বলেই তো তারা নিজেরা নিজেরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে বিএনপি বিষয়টি জানেনি বলে নিজের অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছে। আবার নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এটি চূড়ান্ত তারিখ নয়। অতীতে এ ধরনের নির্বাচনের তারিখ একাধিকবার পরিবর্তনের নজির রয়েছে। তাই আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশনে সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ নেই।’’