গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের লং মার্চ কর্মসূচির পরিবর্তে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিতে বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন।
তিনি বলেছেন, সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে আন্দোলনের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমাধান সম্ভব কিনা, সেটিও দেখা প্রয়োজন। জ্বালানি সংকটের মধ্যে বড় কর্মসূচি না করে বিরোধী দল তাদের প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ) ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রাশেদ খাঁন এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও উপস্থিত ছিলেন।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতপার্থক্য ছিল, সেটি নতুন কিছু নয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপিসহ প্রায় সব দলেরই কোনও না কোনও বিষয়ে ভিন্নমত ছিল।’’
ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নিজের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আমি তখন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আমিও ছিলাম। আমি দেখেছি, সব দলেরই কিছু না কিছু বিষয়ে ভিন্নমত ছিল। বিএনপিরও ছিল, জামায়াতের ছিল, এনসিপির ছিল এবং অন্য দলগুলোরও ছিল।’’
তিনি প্রশ্ন রাখেন, একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কোনও বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করলে সেটিকে অগণতান্ত্রিক হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কিনা।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘বিএনপি অনেক বিষয়ে ঐকমত্যে এসেছে এবং অনেক আলোচনা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদ এখন একটি মীমাংসিত বিষয়। যতটুকু ভিন্নমত ছিল সেটাকে পুঁজি করে আমরা যদি এখনও রাজনীতি করতে থাকি, তাহলে রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে সেই প্রশ্ন থেকে যায়।’’
তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সরকার সেই অনুযায়ী কাজ করছে।’’
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর বিরোধী জোটের ঘোষিত লং মার্চ প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘আন্দোলনের অধিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হলেও সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।’’
বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আপনারা ১৯ সেপ্টেম্বর আবার লং মার্চ করবেন। আমি অনুরোধ করবো, সরকারি দলের কাছে আপনারা আলোচনার প্রস্তাব রাখুন। লং মার্চের মাধ্যমে জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত না করে সরকারকে সহযোগিতা করুন।’’
১১ দলীয় ঐক্য ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লং মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং জ্বালানি ও অন্যান্য জনদুর্ভোগ নিরসনসহ বিভিন্ন দাবি রয়েছে তাদের কর্মসূচিতে।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘সরকার বারবার বিরোধী দলগুলোকে তাদের প্রস্তাব জনগণ ও সরকারের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আন্দোলন করবেন, গণতান্ত্রিক চর্চা করবেন, কিন্তু আলোচনা করে যদি সমাধান করা যায়, তাহলে সেটিও দেখা উচিত।’’
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির সমন্বয়ের প্রশ্ন তুললেন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে আমরা অতীতে সবসময় দেখেছি নির্বাচন কমিশন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নেয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আলোচনা না করেই একজন নির্বাচন কমিশনার কীভাবে নির্বাচনের তারিখ বলতে পারেন? নির্বাচন সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সরকারকেও তো সহযোগিতা করতে হবে।’’
তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি এবং ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।’’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষেই জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে।’’ তাদের মধ্যে বিভক্তি বাড়লে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সরকার জুলাইয়ের সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি অংশ সরকারে রয়েছে, আরেকটি অংশ বিরোধী দলে রয়েছে। আমরা সবাই যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে না পারি, তাহলে এর সুযোগ অন্যরা নেবে।’’
আওয়ামী লীগ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও কথা বলেন রাশেদ খাঁন। বিএনপি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে বা জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে না এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমের প্রসঙ্গও টানেন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ও প্রশাসনে তৈরি হওয়া কাঠামোগত সমস্যার সমাধান অল্প সময়ে সম্ভব নয়।’’
তিনি দাবি করেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পুলিশ ও প্রশাসনে দলীয়করণ এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বিভিন্ন সমস্যা বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ সময়ের সমস্যা ও সংকট এখন বর্তমান সরকারকে সমাধান করতে হচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধানে সময় ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’’
রাশেদ খাঁন বলেন, কারাগারে থাকার সময় তার মুক্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন তার মা। সে সময় বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ না পেলেও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) তাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিল।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘আমি যখন আন্দোলন করে জেলে গিয়েছিলাম, আমার মা আমার মুক্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করার জন্য অনেক জায়গায় গিয়েছিলেন। অনেক জায়গায় তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু ক্র্যাব তার প্রতিষ্ঠানে আমার মাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। সে কারণে আমি আজও ক্র্যাবের প্রতি কৃতজ্ঞ।’’
রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতে না নিয়ে আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী।









