প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের নিশ্চয়তা, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন-এর তৃতীয় দিনের ‘লিডার ইন এন এইজ অব আনসারটেইনিটি’ সেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের সর্বদা এই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করে নিয়েই এগোতে হয়, আর এটিই স্বাভাবিক ও অনিবার্য। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে। তবে এখানে প্রশ্নটি হলো, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের আদর্শ ও নীতিবোধে কোনও নিশ্চয়তা রয়েছে কি না। তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা রয়েছে। সমাজে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে যখনই কোনও সংকট দৃশ্যমান হয়, তা কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এমন একটি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছি, যারা দীর্ঘ সময় পর জনগণের বিপুল ও অকুণ্ঠ ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আমরা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী একটি গণতান্ত্রিক সরকার। আমরা জানি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকতে পারে, তবে জনগণের প্রতি সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ একটি জনগণের সরকার হিসেবে আমরা এটিও গভীরভাবে উপলব্ধি করি যে, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই আমাদের এই দায়িত্বভার।
মাহদী আমিন বলেন, এই সময়ে কিছু ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন রোহিঙ্গা সংকট, যা মূলত আমাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু আমরা প্রস্তুত থাকতে পারি। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে, এই সংকটের সূত্রপাত যে মিয়ানমারে হয়েছে, তার সমাধানও যেন মিয়ানমারেই রচিত হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশ যে ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যাতে যতদিন তারা এখানে অবস্থান করছেন, ততদিন যেন একটি মানবিক জীবন নিশ্চিত করা যায়। তবে এর পাশাপাশি অংশীজনদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
মাহদী আমিন বলেন, প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে। আমরা জানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। প্রযুক্তির কারণে কত কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে তা হয়তো আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না; তবে সঠিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আমাদের বিশাল জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, তা অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন সঠিক দক্ষতায় পুরোপুরি প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠে। সে কারণেই আমরা শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন করছি। সে কারণেই আমরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গনের সমন্বয় বাড়াচ্ছি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করছি এবং কর্মসংস্থানের চাহিদানুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করছি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিজনিত অনিশ্চয়তা ও পরিবেশগত সংকট গভীরভাবে অনুধাবন করেন। এ বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার হিসেবে আমাদের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। আমরা আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করতে চাই। ভূগর্ভস্থ ও প্রাকৃতিক পানির সংরক্ষণ বাড়াতে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল-নদী খনন, পুনঃখনন করতে চাই। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ঐতিহাসিক পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার। এর মূল লক্ষ্য অভিন্ন, প্রয়োজনের সময় পানি ধরে রাখা এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কখন আবার নতুন কোনও বৈশ্বিক আর্থিক ধাক্কা বা অর্থনৈতিক সংকট আসতে পারে। কিন্তু আমরা এমন সঠিক নীতি প্রণয়ন করে প্রস্তুত থাকতে পারি, যা প্রতিটি পেশার প্রতিটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারে। নারীদের সুরক্ষায় আমাদের রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, যা প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি মায়ের ভাগ্য পরিবর্তন করবে। কৃষকদের জন্য রয়েছে ‘ফার্মার কার্ড’। দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা ‘হেলথ কার্ড’ চালুর চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছি। মূলত আমরা একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
তিনি বলেন, কাজেই চ্যালেঞ্জ থাকবেই। তবে আমরা প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে দেখি সমস্যা সমাধানের এবং আমাদের জনগণের ক্ষমতায়নের এক একটি সুযোগ হিসেবে। সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী; যেন দেশের প্রতিটি ঘরে এমন একজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন, যিনি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পাশে দাঁড়াতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বলেন, মাত্র সাত মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এই বার্তা দিয়েই শেষ করতে চাই, আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু সংকট পেয়েছি। যেমন জ্বালানি খাত; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কীভাবে মোড় নিচ্ছে তা হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে, তা জ্বালানি তেল, গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন। তাই আমরা বহুমুখী উৎসের দিকে যাচ্ছি এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি সংকটের সময়েই আমাদের লক্ষ্য থাকে জনগণ কী চায় তা শোনা এবং নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তারই প্রতিফলন ঘটানো।