দুর্নীতির দায়ে জেলার বরখাস্ত, পরীক্ষক বাধ্যতামূলক অবসরে

দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও নথিপত্র জালিয়াতির অভিযোগে দুই জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রবিবার (১১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৩ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পঞ্চগড় জেলা কারাগারের সাবেক জেলার আব্দুল ফাত্তাহকে কারাগারের ‘খোরাকী রেশন’ খাত থেকে এক কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহাকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকার ভুয়া ভ্রমণ ভাতা উত্তোলনের অভিযোগে চাকরি হতে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

উভয় সিদ্ধান্তই সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর অধীনে বিভাগীয় তদন্ত এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে।

বিভাগীয় তদন্তে, ‘বাবা মায়ের দোয়া’, ‘নূর স্টোর’ ও ‘শুভ স-মিল’ নামের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৭টি ভুয়া বিল পাস করে অনিয়ম করার ক্ষেত্রে আব্দুল ফাত্তাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন যে, কয়েদির সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দের আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল এবং কেনাকাটা ও অর্থ পরিশোধের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তদন্তে কারাগার প্রশাসন ও আর্থিক প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগও চিহ্নিত করা হয়েছে। অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মামলা তদন্ত এবং বিপিএসসির সম্মতির পর, মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের বিধিমালার ৪(৩)(ঘ) ধারা অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

পৃথক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা ঢাকায় কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতের সমন ও সাক্ষ্য প্রদানের সার্টিফিকেট তৈরি করে সেসব আদালতে সাক্ষ্য না দিয়েও ভুয়া বিলের বিপরীতে বিধি বহির্ভূতভাবে বিল করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেন। 

তিনি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে থেকেও আদালতের সমন ও সাক্ষ্য প্রদানের সার্টিফিকেট জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল দাখিল করেন।

প্রজ্ঞাপনের আরও বলা হয়, তার ভ্রমণ বিবরণী ও বিল অতিরিক্ত মহাপরিচালক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কর্তৃক অনুমোদন হওয়ার বিধান থাকলেও ভ্রমণকারী কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ও প্রত্যয়নপত্রের স্থানে ভিন্ন-ভিন্নভাবে তিন ধরনের স্বাক্ষর হয়েছে অথচ তিনক্ষেত্রেই সিল ব্যবহার করা হয়েছে প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকের। 

২০০০ সালের ২৮ জুন তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে রাসায়নিক পরীক্ষক পদে (৬ষ্ঠ গ্রেডে) যোগদান করেন এবং ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একই গ্রেডে (৬ষ্ঠ গ্রেডে) কর্মরত ছিলেন। এ সময়সীমার মধ্যে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ সফরের ক্ষেত্রে বিমানযোগে ভ্রমণের প্রাধিকারভুক্ত না হয়েও গত ২৩ বৎসরে শতাধিকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে বিমানে যাতায়াতের ভ্রমণ বিল দাখিল করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি সর্বমোট তিন লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকা বিধি বহির্ভূতভাবে সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করে আত্মসাৎ করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।

গত বছর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি অনুযায়ী তাকে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি পরায়ণ’ এর দায়ে অভিযুক্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়েরপূর্বক অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী প্রেরণ করে কারণ দর্শানো হয়। 
তিনি অভিযোগনামার জবাব প্রদান করে ব্যক্তিগত শুনানির প্রার্থনা করেন। তার ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিল করা প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৪(৩) (খ) বিধি অনুযায়ী তাঁকে ‘চাকুরী হইতে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান সূচক গুরুদণ্ড প্রদানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয় এবং তিনি দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দাখিল করেন। 

দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব, অভিযোগের গুরুত্ব এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়াদি পর্যালোচনায় তাকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান’ সূচক গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ এর রেগুলেশন-৬ অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।