গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বেতন-ভাতা, অবসরকালীন আনুতোষিকসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানদের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অবসরকালীন আনুতোষিক, থানায় যাতায়াত ভাতা ও মোবাইল ফোনের খরচও বাড়ানো হয়। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর থেকেই এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশের মহাসমাবেশে এসব ঘোষণা দেন তিনি। এ সময় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা রক্ষায় গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের কোথায় কী ঘটছে, কারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে কিংবা কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে কি না, এসব বিষয়ে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সুবাদে আগাম তথ্য পেতে পারেন। এসব তথ্য দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হলে অপরাধ প্রতিরোধ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে পুরো বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি বজায় রাখা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় পর্যায়েও পড়বে। শহরায়ন ও নগরায়ন বাড়লেও দেশের অধিকাংশ মানুষের শিকড় এখনও গ্রামকেন্দ্রিক। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই উন্নত, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গ্রামাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সমাজেও ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছিল। বিভিন্ন স্বার্থ ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছিল। এর প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে তৃণমূল সমাজ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জায়গায় প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে সমাজকে বের করে আনতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। এসব মূল্যবোধ সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদের অবশ্যই আইনসম্মত, মানবিক, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব হতে হবে। একটি নিরাপদ ইউনিয়ন বা গ্রাম গড়ে তুলতে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ এবং সচেতন জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এই তিন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় যত ভালো হবে, গ্রাম ও ইউনিয়নগুলো তত বেশি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তাদের অনেক কাজ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নেওয়া একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্তও স্থানীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাস চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং তা কার্যকর হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও সারা দেশের ৪০ হাজারের বেশি গ্রাম পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের মাসিক বেতন বেড়েছে ৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে গ্রাম পুলিশ প্রধানদের মাসিক বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবসরকালীন আর্থিক সুবিধাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যরা অবসরের পর আগে ৭০ হাজার টাকা আনুতোষিক পেতেন। নতুন সিদ্ধান্তে তা বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একইভাবে গ্রাম পুলিশ প্রধানদের অবসরকালীন আনুতোষিক ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক গ্রাম পুলিশ সদস্যকে মোবাইল ফোনের খরচ বাবদ মাসে ১৫০ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে স্থানীয় থানায় যাতায়াতের ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। আগে সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যরা থানায় সাপ্তাহিক হাজিরার জন্য ৩০০ টাকা পেতেন। নতুন সিদ্ধান্তে তা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়। গ্রাম পুলিশ প্রধানদের ক্ষেত্রে এই ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের বিষয়েও নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে আরও দুইজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নারী গ্রাম পুলিশের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একইসঙ্গে নারী গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটি নির্ধারণের ঘোষণাও দেন তিনি।
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের কাজের স্বীকৃতি ও কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দিতে প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়কের নাম ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ রাখার সিদ্ধান্তের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব সড়কে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় গাছ লাগানো হবে। পরবর্তী সময়ে গাছগুলো বড় হলে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এছাড়া গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সাইকেল সরবরাহের সময়সীমা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতি পাঁচ বছর পরপর তাদের একটি করে বাইসাইকেল দেওয়া হয়। এই সময়সীমা কমিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যাতায়াত সুবিধা আরও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।